রূপালী গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘প্রশ্নের মধ্যেই ভুল’ (১৮-৯) সাম্প্রতিক সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ। যে কোনও বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণ কোনও প্রশাসনিক দফতর নয়, বরং এটি মুক্ত চিন্তা, জ্ঞানচর্চা ও উন্নত গবেষণার কেন্দ্র। উচ্চশিক্ষার এই পরিবেশ গড়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসনের উপর ভিত্তি করে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নির্দিষ্ট পঠনপাঠন এবং গবেষণার প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী শিক্ষক ও গবেষক নিয়োগ করে থাকে। বছরের পর বছর ধরে এক জন শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে উন্নত গবেষণাগার তৈরি হয় এবং বহু গবেষক শিক্ষার্থী তাঁদের গবেষণা এগিয়ে নিয়ে যান। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক বদলির নীতি প্রয়োগ করা উচ্চশিক্ষার মূল কাঠামোর পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর। এক জন শিক্ষককে হঠাৎ অন্য প্রতিষ্ঠানে বদলি করে দিলে তাঁর অধীনে চলা দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রকল্পগুলি মাঝপথে থমকে যেতে বাধ্য। গবেষক শিক্ষার্থীরা তাঁদের নির্দেশককে হারাবেন, যা তাঁদের ভবিষ্যৎকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেবে। কারণ নতুন কর্মস্থলে একই ধরনের গবেষণার পরিকাঠামো বা সহায়ক ক্ষেত্র না-ও থাকতে পারে। ফলে প্রতিষ্ঠানের অর্থ ও শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময় দুই-ই নষ্ট হবে। শিক্ষার্থীরা পথভ্রষ্ট হবেন। উচ্চশিক্ষাকে আমলাতান্ত্রিক বদলির নিয়মে বেঁধে ফেললে গবেষণার গতি ও মান দু’টিই বিনষ্ট হয়।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান কেবল রাজ্যে নয়, সারা দেশের গর্ব। এখানকার অ্যাকাডেমিক উৎকর্ষ এবং গবেষকদের অবদান বিশ্ব জুড়ে স্বীকৃত। সারা পৃথিবীতে যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীরা ছড়িয়ে আছেন। এখানে উচ্চ-মেধার ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়া করেন। তাঁদের মধ্যে কিছু জন বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু পাশাপাশি তাঁরা লেখাপড়াটাও গভীর মনোযোগ দিয়ে করেন। এখন রাজনৈতিক মতাদর্শের সংঘাত বা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের খাতিরে যদি এমন কোনও কঠোর নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে তা সরাসরি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশকে আঘাত করবে। কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দলীয় রাজনীতির সঙ্কীর্ণ ঘেরাটোপে আটকে ফেলার চেষ্টা মুক্ত চিন্তার পরিপন্থী। এতে আন্তর্জাতিক স্তরে আমাদের মেধার যে সুখ্যাতি রয়েছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস হলে তার মাসুল পুরো সমাজকেই দিতে হয়। তাই প্রশাসনিক আধিপত্য কায়েমের উদ্দেশ্যে নীতি প্রণয়ন না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিসর ও শিক্ষকদের স্বাধীনতা রক্ষা জরুরি।
গৌতম পতি, তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুর
বিচ্ছিন্ন নয়
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে রূপালী গঙ্গোপাধ্যায় ‘প্রশ্নের মধ্যেই ভুল’ প্রবন্ধে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলি নীতি কার্যকর করার বিপরীতে কিছু যুক্তি তুলে ধরেছেন, যা খণ্ডন করা মুশকিল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণ পরিবারের মেধাবী সন্তানদের স্বপ্ন পূরণের সোপান। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস গন্ডগোলের কারণে অতীতেও বহু বার সংবাদের শিরোনামে উঠে এসেছিল, যার দায় কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারেন না। এটাও ঠিক, পুলিশ-প্রশাসনের সহযোগিতা থাকলে অনেক ক্ষেত্রেই অবাঞ্ছিত ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়। কিন্তু, সরকারের মর্জি মতো উপাচার্যরা যদি পদক্ষেপ না করেন, তা হলে কতটা সহযোগিতা মেলে, তা তৃণমূল সরকারের আমলে যেমন বিশ্বভারতী, যাদবপুর এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, তেমনই পালাবদলের পর যাদবপুরও ব্যতিক্রম নয়।
ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এক শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের মৌরসিপাট্টা শিক্ষাঙ্গনকে কী ভাবে কলুষিত করে, দক্ষিণ কলকাতা ল কলেজ তার জ্বলন্ত উদাহরণ। শাসক দলের নেতাদের প্রশ্রয় এবং কিছু ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে বিভিন্ন জায়গায় তাঁদের বাড়বাড়ন্ত। যাদবপুর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ার পিছনে অনেকেই শাসক দলের রাজনৈতিক অভিসন্ধি খুঁজে পান। শিক্ষকদের সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া বিরুদ্ধ মতবাদের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে কি প্রভাব ফেলে না? পড়ানোর ক্ষেত্রে সুনামের অধিকারী হলেও তাঁরা যদি বিশেষ কোনও রাজনৈতিক দলের হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, এই প্রভাবের নেতিবাচক দিকটি তখন আরও প্রকট হওয়াই স্বাভাবিক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়নের জন্য শিক্ষার পরিকাঠামো-সহ উপযুক্ত পরিবেশ অপরিহার্য। অভিভাবক হিসাবে এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা কি অস্বীকার করা যায়? অধ্যাপকদের বদলি যদি পঠনপাঠন এবং গবেষণামূলক কাজের বিঘ্ন ঘটায়, তা হলে কি বিকল্প পথ খোঁজা যায় না?
ধীরেন্দ্রমোহন সাহা, কলকাতা-১০৭
বিরোধিতা
‘প্রশ্নের মধ্যেই ভুল’ প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে বলি, নিজে নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে পাশ করা প্রযুক্তি বিভাগের এক স্নাতক এবং দু’বছর আগেই পাশ করা প্রযুক্তি বিভাগের আর এক স্নাতকের অভিভাবক সূত্রে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার পরিচিতি বহু দিনের। একাধারে ছাত্র এবং দায়িত্বশীল অভিভাবক— দু’ভাবেই বেশ কিছুটা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্ববিদ্যালয়কে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। সেই দুই ভিন্ন রকমের অভিজ্ঞতা থেকেই বলি যে, প্রবন্ধকার অত্যন্ত সততার সঙ্গে সুন্দর ভাবে বর্তমান পরিস্থিতি এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ তুলে ধরেছেন।
এই সময়ের ব্যবধান তিন দশকেরও বেশি। এই সময়কালে আমাদের রাজ্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামের কিছুটা অধঃপতন হয়েছে, এটা অনস্বীকার্য। কিন্তু যে কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল যে স্তম্ভ, সেই ক্লাসরুম, তার বিন্যাস এবং পরিবেশ এখনও যাদবপুরে প্রায় একই রকম আছে। আজও শ্রেণিকক্ষগুলিতে যেমন শহরের নামকরা ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি আছে, তেমনই প্রত্যন্ত সরকারি বিদ্যালয় থেকে উচ্চ মাধ্যমিক বা জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় ভাল রেজ়াল্ট করে আসা ছেলেমেয়েদেরও ভিড়। প্রবন্ধকারের সঙ্গে একমত যে, এমন বিপ্রতীপ পারিবারিক পরিবেশ থেকে আসা ছাত্রছাত্রীদের মিলনক্ষেত্র যাদবপুরের বিশেষত্ব, যা রাজ্যের অন্য কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় নেই বললেই চলে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যাঁদের কোনও রকম যোগাযোগ নেই, তাঁদের পক্ষে এটা জানা সম্ভব নয়। তাই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সম্বন্ধে বিভিন্ন বিষয়ে ক্রমাগত বিষোদ্গার করে যান সমাজের একাংশ।
অভিযোগ হল— যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে ছাত্রছাত্রীদের অধিকাংশই নাকি রাষ্ট্রবিরোধী। যাঁরা বলছেন, তাঁদের হয়তো জানা নেই ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের আবহে তৈরি হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মবৃত্তান্ত। তাঁরা হয়তো জানেন না, কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানের কথা। পূর্ববর্তী রাজ্য সরকারের সময়ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রশাসনের এই রকমই অনভিপ্রেত বিরোধ প্রত্যক্ষ করা গিয়েছিল। এই বিরোধী সম্পর্ক কখনও কাম্য নয়।
আনন্দ মুখোপাধ্যায়, কলকাতা-৭৮
সরাসরি
সম্প্রতি কলকাতা তথা বাংলার মাটিতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় কয়েকটি ফুটবল খেলা হয়েছে, কিন্তু সরকারি উদাসীনতার জন্য মানুষ তা দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। সবার পক্ষে মাঠে গিয়ে সরাসরি খেলা দেখা সম্ভব নয়। সুতরাং, এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খেলাগুলি অ্যাপে নয়, সরাসরি টিভি-তে সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা হোক।
সত্যেন মুখোপাধ্যায়, বাগনান, হাওড়া