অনুরাধা রায়ের ‘আধমরাদের ঘা মেরে’ (২৯-৭) প্রবন্ধে তরুণ সমাজ তথা যৌবনের শক্তি, সামাজিক অন্যায় ও ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ এবং সেই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ অভিমুখ নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। এ কথা সত্য যে, ফরাসি বিপ্লব, মাও জে দং-এর তরুণ আন্দোলন এবং ষাটের দশকের বিশ্বব্যাপী ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম (মাস্টারদা সূর্য সেন, সুভাষচন্দ্র বসু প্রমুখ) ও নকশালবাড়ি আন্দোলন— ইতিহাসের প্রতিটি মোড়ে তরুণদের এই আপসহীন প্রতিবাদই পরিবর্তন এনেছে। প্রবন্ধকার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, যৌবন কেবল বয়সের সীমারেখা নয়, এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর একটি প্রবল মানসিক ক্ষমতা।
মনোবিদ এরিক এরিকসনের তত্ত্বের উল্লেখ করেছেন প্রবন্ধে। বয়ঃসন্ধি ও যৌবনের সংযোগস্থলে তরুণেরা নিজস্ব পরিচয় তথা আইডেন্টিটি খোঁজে। কিন্তু বর্তমান সমাজকাঠামো, শিক্ষাব্যবস্থার অন্ধকার ভবিষ্যৎ এবং তীব্র অনিশ্চয়তা তাদের মানসিক চাপ ও সঙ্কটের দিকে ঠেলে দেয়। বর্তমান বিশ্বায়ন ও পুঁজিবাদী সমাজ তরুণের স্বপ্নকে কেবল ‘ব্যক্তিগত কেরিয়ার’ ও পরীক্ষার সাফল্যের গণ্ডিতে বেঁধে ফেলছে। অন্য দিকে, স্বার্থান্বেষী রাজনীতি তরুণদের আবেগকে ব্যবহার করে কখনও ধর্মান্ধতা, কখনও হিংসার দিকে চালিত করার চেষ্টা করে। সেই কারণে প্রশ্ন জাগে তরুণদের এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ কি শুধুই ক্ষণিকের আবেগ, না কি তা এক দীর্ঘমেয়াদি সুস্থ সমাজ পরিবর্তনের বীজ বপন করছে? প্রবন্ধকার প্রশ্ন তুলেছেন— পরীক্ষার দুর্নীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য, প্রকৃতিবিনাশী ‘উন্নয়ন’ এবং ক্ষমতার স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা এই বিক্ষোভ-প্রতিবাদ কি সত্যিই কোনও স্থায়ী সাম্য ও মানবিকতার দিশা দেখাতে পারবে?
আসলে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যখন অন্যায়ের অভ্যাসে নিজেকে সঁপে দেয়, তখন যৌবনের বর্ধিত প্রতিবাদী শক্তি তাকে ভেঙে নতুন করে গড়ার জন্য প্রাণ জোগায়। বিশ্বকবির সুরে সুর মিলিয়ে তারা বলতে চায় “আমি ঢালিব করুণা-ধারা,/ আমি ভাঙিব পাষাণ-কারা।”
বিশ্বরূপ দাস, শ্রীপল্লি, পূর্ব বর্ধমান
গুরুত্ব কিসে
অনুরাধা রায়ের ‘আধমরাদের ঘা মেরে’ প্রবন্ধের বক্তব্য এবং সোনম ওয়াংচুকের এক্স হ্যান্ডেলে বার্তা ‘বিজয়ের সঙ্গে বিনয় থাকাও আবশ্যক’— যেন একই সুতোয় গাঁথা দু’টি ফুল। সিজেপি’র এক্স হ্যান্ডেলেই পোস্ট করা হয়েছিল বিতর্কিত ভিডিয়োটি, ক্যাপশনে লেখা হয়েছিল ‘ইস্তফার খুশিতে’— সেই পরিপ্রেক্ষিতেই ওয়াংচুকের উপরোক্ত বার্তাটি। নিট কেলেঙ্কারির কারণে অনেক পড়ুয়া আত্মহত্যা করেছেন, তাঁদের পরিবার এখনও শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি, সেই সময় উল্লাসের এই ছবি অসংবেদনশীল। কিন্তু এর পরেও সিজেপি’র মুখপাত্র সৌরভ দাস এক্স হ্যান্ডেলে যা লিখেছিলেন, তার মধ্যে যেন খানিক ঔদ্ধত্যের গন্ধই পাওয়া যায়। কলকাতায় ধর্মতলার বুকে ২৪ জুলাই গণতন্ত্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ সাংবাদিকদের উপর হামলা হয়। ৩৬ দিনের আন্দোলনের প্রথম ৩০-৩১ দিন মূলধারার সংবাদমাধ্যমে কোনও প্রচারই পায়নি, এটাই কি ক্ষোভের একমাত্র কারণ? জানা গিয়েছে, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার ঠিক আগের মুহূর্তে কেন্দ্র তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে না সরিয়ে স্রেফ দফতর বদল করার যে বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছিল, তা সরাসরি খারিজ করে দিয়েছিল সিজেপি। এটি সত্যি হলে প্রশ্ন ওঠে— কোন দাবিটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, শিক্ষা এবং পরীক্ষাব্যবস্থার আমূল সংশোধন, না কি ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা?
প্রবন্ধকার উল্লেখ করেছেন, এত কোচিং সেন্টারের বাহুল্য কেন, সমাজে অর্থপূর্ণ অবদান রাখার, না কি ভাল ব্যক্তিগত কেরিয়ার গড়ার উদ্দেশ্যে? বহুব্যাপ্ত স্বার্থপর ব্যক্তিবাদকে পরাভূত করে আজকের এই নবজাগ্রত চেতনা কি দীর্ঘমেয়াদি সমাজ-পরিবর্তনের সূচনা করতে পারবে? এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে পঞ্চাশ বছর আগে যখন আইআইটি এবং জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষার প্রস্তুতি নিই, তখন কোথায় কোচিং সেন্টার? প্রস্তুতি নিজের এবং স্কুলশিক্ষক দ্বারা, আর কিছু গাইড বুক। আর এখন? উদ্বেগ তৈরি করা, আশা বিক্রি করা, পুনরাবৃত্তি করা— এই কোচিং শিল্পের বাজারমূল্য আজ প্রায় ষাট হাজার কোটি টাকা।
সুপ্রিয় দেবরায়, বরোদা, গুজরাত
কুর্নিশ
সম্পাদকীয় ‘প্রজন্মান্তর’ (২৮-৭)-এর পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। হ্যামলেট নাটকের এক জায়গায় প্রিন্স অব ডেনমার্ক বলেছিলেন, ‘অল ইজ় নট ওয়েল’। দিল্লির যন্তর মন্তরে জেন-জ়ি’দের আন্দোলন দ্ব্যর্থহীন ভাষায়, চোখে আঙুল দিয়ে যেন এই বার্তাটিই দিয়ে গেল। পাখির মতো কাঁটাতারের বেড়া অগ্ৰাহ্য করার সাহস দেখাল এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা। প্রবল পরাক্রমী শাসকের চোখের সামনে আয়না ধরার কাজটা করে গেল এই প্রজন্ম, যাদের আমাদের মতো মধ্যবয়স্ক, এবং প্রৌঢ়ত্বের দোরগোড়ায় পৌঁছনো মানুষজন ভাবতাম মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকা একটি বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত আত্মকেন্দ্রিক প্রজন্ম। বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বার বার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাওয়ার সঙ্গে যে ছাত্রযুবদের স্বপ্নও চুরি হয়ে যায়— এ কথা যদি শাসকশ্রেণি (সেটা যে কোনও রাজনৈতিক দল হতে পারে) একটু সংবেদনশীলতার সঙ্গে বোঝার চেষ্টা করত, তা হলে হয়তো দেশ জুড়ে এত তরুণ-প্রাণের অকাল বিসর্জন ঘটত না।
সত্যিটা বলা যেমন কঠিন, সত্যিটা শোনাও তেমন সহজ নয়। কিছু স্বঘোষিত ‘রাষ্ট্রবাদী’ খুব সহজেই চেনা ঢঙে এই জেন-জ়ি’দের গায়ে ‘দেশদ্রোহী’র তকমা সেঁটে দিয়েছেন! অথচ, একটু খেয়াল করলেই দেখা যায় যে, এই আন্দোলনকারীরা অর্থের দাবি করেনি, এরা কোনও নিশ্চিত চাকরিরও দাবি করেনি। জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা যাতে সুষ্ঠু ভাবে, ন্যায়ের পথে পরিচালিত হয়— এই তো ছিল মূল দাবি। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সহজ করার দাবি নয়, দাবি কেবল একটিই— স্বচ্ছতা। একটি দেশ, যেখানে যুবসমাজকে সতত বলা হয় যে ‘মেধা-ই গুরুত্ব রাখে’, সে দেশে এই দাবিটা কি খুব বেশি চাওয়া?
জনপ্রিয় লেখক চেতন ভগত তাঁর সাম্প্রতিক একটি নিবন্ধে যথার্থই লিখেছেন ‘জেন-জ়ি’র ‘জ়ি’ হল ‘জ়িল’, ‘জ়েস্ট’ এবং ‘জ়িরো ফিয়ার’-এর প্রতীক। তাই, বিনম্র কুর্নিশ জানাতেই হচ্ছে এই আধুনিক ভারতীয় প্রজন্মকে।
অয়নকুমার মল্লিক, বাগনান, হাওড়া
স্বাধীনতার স্বপ্ন
ভারতের আশিতম স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপিত হল। অসংখ্য স্বাধীনতা সংগ্রামীর আত্মত্যাগ, প্রাণদানের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা অর্জন। দুঃখের বিষয়, ভারতে দুর্নীতি যে ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা যে ভাবে বাড়ছে, তাতে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কোনও ব্যবস্থা তখনই সফল হয়, যখন সেই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত মানুষরা সৎ, যোগ্য ও মানবিক হন। ‘ভাল মানুষ’ তৈরির মূল ভিত্তি শিক্ষা। তাই দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে সাজাতে হবে। প্রয়োজন, যুগোপযোগী শিক্ষানীতি, স্বাস্থ্যনীতি ও ক্রীড়ানীতি। নিজের দেশ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ভাল ভাবে জানা ও বোঝার সঙ্গে সুস্থ সংস্কৃতির প্রসারে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।
প্রয়োজন সর্বজনীন শিক্ষার প্রসার এবং শিক্ষার গুণগত মানের উন্নতি। বিদ্যালয়ে মূল্যবোধের শিক্ষার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা এবং যুগোপযোগী পাঠ্যক্রমের উপর জোর দিতে হবে। সরকারকে জাতীয় আয়ের একটি বড় অংশ শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যয় করতে হবে। সরকার যদি শিক্ষার বিষয়ে আন্তরিক হয়, তবেই একটি উন্নত দেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
অভিজিৎ দত্ত, জিয়াগঞ্জ, মুর্শিদাবাদ