যদি পঁচিশ বছর পর ফিরে তাকিয়ে বলতে হয়, ‘৯/১১’ ঘটনাটির প্রধান গুরুত্ব কী, উত্তরটি সহজ হবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর কোনও ঘটনা এই ভাবে সমগ্র বিশ্বকে চিরতরে ওলোটপালট করে দেয়নি। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকায় সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে এবং ভারতীয় সময় সন্ধে ৫টা ৪৪ মিনিটে একটি রেখা মুহূর্তমধ্যে টানা হয়ে গিয়েছিল। দু’টি প্লেন নিউ ইয়র্কের দু’টি টাওয়ারে প্রবেশ করে যে বিস্ফোরক বিধ্বংস ঘটিয়েছিল, তা কেবল তার নিহিত গুরুত্ব কেবল ঘটনার পারম্পর্যে ‘বিশাল’ নয়, তা দৃশ্যগত ভাবে আশ্চর্য, অভূতপূর্ব, আতঙ্কজনক ভাবে ‘বিশাল’। এক মানস-জাগতিক বিস্ফোরণের শামিল। অবাক লাগতে পারে ভেবে, তার আগে এমন কোনও ইঙ্গিত ছিল না যে, এত বড় একটা বিস্ফোরণ ঘটতে চলেছে। প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনের আমেরিকা ছিল যথেষ্ট শান্ত ও স্থিতপ্রত্যয়ী। ২০০০ সালের শতকারম্ভে বিশেষজ্ঞরা মনে করেছিলেন যে পশ্চিম এশিয়ার সন্ত্রাসী গোষ্ঠী যেমন আল-কায়দা— মোটের উপরে নিজেদের লক্ষ্যসাধনে ব্যর্থ হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছিল পশ্চিমি সভ্যতার বিশ্বায়ন-রথের সাফল্য, এবং তার সঙ্গে বিশ্ব জুড়ে সেই রথের আবাহন। খুব কম মানুষের মনেই সন্ত্রাসের সাফল্যচিন্তা তখন স্থান পেয়েছিল। পঁচিশ বছর পর ফিরে ভাবতে গেলে এই শিক্ষা প্রথমেই নেওয়া ভাল যে, যা ভাবা যায় তা ঘটে না, মানুষের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ এখনও ভয়াবহ ভাবে সীমিত ও তার নিজের প্রেক্ষাপট ও দৃষ্টিকোণ দিয়ে বিশেষ ভাবে অবরুদ্ধ। ৯/১১ নিশ্চিত ভাবে বিশ্বদুনিয়াকে এই শিক্ষা দিয়ে গিয়েছে।
বুঝিয়ে দিয়েছে, যে কোনও মুহূর্তে এমন একটি ঘটনাতে বিশ্বমতের মেরুকরণ ঘটে যেতে পারে, যাকে মনে হয় আপাত-শান্তি, তা ছারেখারে যেতে পারে, যাকে মনে হয় মতৈক্য বা মতসাদৃশ্য, তীব্র বিস্ফোরণে তা ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে পারে। আকস্মিক পরমাণু বিক্রিয়া দিয়ে মানুষ প্রচণ্ড শক্তিতে বস্তুজগৎ ও প্রাণজগৎ যে ভাবে মুহূর্তে উড়িয়ে দিতে শিখেছে। তেমনই এমন ঘটনা ঘটতেই পারে যা আকস্মিক মানস বিক্রিয়া ঘটিয়ে মনোজগতের ভারসাম্য মুহূর্তে উল্টেপাল্টে দিতে পারে।পশ্চিমি সমাজ এর পর বিদ্বেষে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে, পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ার সমাজ ক্রমে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ‘অশুভ অক্ষ’ ঘোষণায় ইরান, ইরাক ও উত্তর কোরিয়াকে অবধারিত লক্ষ্য করে তোলা, ইরাক যুদ্ধ ও আফগানিস্তান যুদ্ধ তৈরি করে সুদীর্ঘমেয়াদিঅস্থিতি, ক্রোধ ও সন্ত্রাসী ভাবনায় পশ্চিম ও মধ্য এশিয়াকে পুনঃ-প্রোথিত করা, ইরান এবং ইজ়রায়েল ও তার মিত্র পশ্চিমি দেশসমূহের মধ্যে শত্রুতায় প্রতিশ্রুতির পুনর্নবীকরণ করা— আগামী পঁচিশ বছরেও এই বাস্তব পাল্টানোর বিশেষ সম্ভাবনা নেই। গত কয়েক বছরে যে ভাবে প্যালেস্টাইন-সঙ্কট নতুন করে বিশ্বমানসের মেরুকরণ ঘটিয়েছে, তাও এই ৯/১১-র সঙ্গেইযুক্ত। নতুবা ইজ়রায়েল ও আমেরিকার এই ভয়ঙ্কর গাজ়া আক্রমণ এমন প্রবল বিশ্বসমর্থন পেত না, বিশ্বকূটনীতির বিশ্বাসযোগ্যতা এমন ভাবে বিনষ্ট হয়ে যেত না। আজকের ভূরাজনীতি ৯/১১-র ‘দান’। ওসামা বিন-লাদেন হয়তো ঠিক এমনটাই ঘটাতে চেয়েছিলেন, তাঁর মনোগত চিত্রনাট্যই আজ আড়াই দশক পর অনুসৃত হয়ে চলেছে। সমগ্র পৃথিবী ‘আমরা-ওরা’ দু’টি স্পষ্ট পক্ষে বিভক্ত হয়েছে।
যুদ্ধ মানেই প্রতিপক্ষকে ‘ডিহিউম্যানাইজ়’ করা বা মানবিক দৃষ্টিতে না দেখা। কিন্তু ৯/১১-পরবর্তী পৃথিবী যেন নৈতিক পাসপোর্ট পেয়ে গিয়েছে সেই কাজটি করার জন্য। ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামবিদ্বেষ আগেও ছিল। কিন্তু ৯/১১-পরবর্তী পৃথিবী প্রবল ও অভূতপূর্ব দাপট ও আত্মপ্রত্যয় নিয়ে সেই বিদ্বেষ প্রকাশ, প্রচার ও যাপন করে থাকে। যুদ্ধ বা আক্রমণ আগেও কাউকে বার্তা দেওয়ার জন্যপরিকল্পনা করা হত। ৯/১১ প্রথম সন্ত্রাস যে সরাসরি মিডিয়া বা প্রচারমাধ্যমে ‘সেনসেশন’ ঘটানোর জন্যই পরিকল্পিত হয়েছিল, এবং তার পর থেকে এটি একটি ধারা হয়ে দাঁড়ায়। যুদ্ধে আগেও সব অন্যায় চলত, কিন্তু আধুনিক বিশ্ব সামরিক নৈতিকতার যে ভাবনা ভেবেছিল, ৯/১১ তা ধ্বংস করে দিয়ে যায়। নিরাপত্তা বিষয়ক চিন্তাভাবনা এবং সেই সূত্রে নাগরিক অধিকার বিষয়ক বিবেচনা সে দিনটির পর পাল্টে যায়। সুতরাং পঁচিশ বছরের আগের সেই দিনের জয়-পরাজয় আসলে সেই দিনটির নয়— তাবৎ অনাগত বিশ্বের।