পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত আইনে সংশোধন আনা হবে, জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর ক্ষোভ, রাজ্যে পালাবদলের পর থেকে প্রায় দু’হাজার তৃণমূল প্রধান পলাতক, দেরি হচ্ছে ভিবি-জি-রামজি রূপায়ণে। পঞ্চায়েত মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত আইনের (১৯৭৩) সংশোধন করে প্রধানদের হাত থেকে কার্যনির্বাহী সচিবদের হাতে তুলে দেওয়া হবে আর্থিক ক্ষমতা— ওড়িশা-সহ বিভিন্ন বিজেপি-শাসিত রাজ্যে স্থানীয় প্রশাসনের যে মডেল চালু রয়েছে, সেই ভাবে। বলাই যায়, ইতিহাসের নিরিখে এই আইন হবে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার উল্টো যাত্রা— ক্ষমতা থেকে ক্ষমতাহীনতায়। পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত আইনের বলে গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান একমাত্র জনপ্রতিনিধি, যাঁর হাতে রয়েছে আধিকারিকের ক্ষমতাও। “উপরে ভগবান, নীচে প্রধান”— বাম আমলে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া এই কথা পঞ্চায়েতের ক্ষমতার সাক্ষ্য দিত। এর পিছনে ছিল বিকেন্দ্রিত প্রশাসনের তত্ত্ব— গ্রামে গ্রামে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রেখে চলবেন, তাঁদের চাহিদা বুঝে উন্নয়নের পরিকল্পনা নেবেন ও রূপায়ণ করবেন। সরকারি সহায়তায় যাঁদের অগ্রাধিকার, তাঁদের নাম সুপারিশ করবেন। এলাকার উন্নয়নে গ্রামের মানুষের ভূমিকায় গণতন্ত্র আরও গভীর হবে। সত্তরের দশকে বাম ফ্রন্ট সরকার পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূমি সংস্কার, ক্ষুদ্র সেচের প্রসার করে গ্রামীণ রোজগার বাড়িয়েছিল। পাশাপাশি তফসিলি জাতি, জনজাতি এবং মহিলাদের স্থান করে দিয়েছিল স্থানীয় প্রশাসনে। এই সাফল্য কেন্দ্রেরও নজর কেড়েছিল। সংবিধান সংশোধন (১৯৯২) করে পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থাকে সারা দেশে প্রতিষ্ঠা করার পিছনে পশ্চিমবঙ্গের ভূমিকা কম নয়।
নব্বইয়ের দশকে বাম ফ্রন্ট উদ্যোগ করেছিল গ্রাম পঞ্চায়েতেরও নীচের স্তরে স্বশাসনকে নিয়ে যেতে। গ্রাম সংসদ স্তরে গ্রাম উন্নয়ন কমিটি তৈরি করে বাজেট বরাদ্দ করা, গ্রাম পঞ্চায়েতের উপসমিতিগুলির ক্ষমতায়ন করা হয়েছিল। তবে আগাগোড়াই পঞ্চায়েত ব্যবস্থার উপরে দলীয় নিয়ন্ত্রণ ছিল পুরোমাত্রায়। বাম জমানার শেষ থেকেই বিকেন্দ্রীকরণের ঝোঁক কমে আসে— বিশেষত ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল ভাল ফল করার পরে। ২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরে পঞ্চায়েতের স্বাতন্ত্র্য কমেছে, প্রাধান্য বেড়েছে সরকারি আধিকারিকদের। পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি, জেলা পরিষদের সভাধিপতিদের দায়িত্ব সরে গিয়েছে জেলার আধিকারিকদের হাতে। সরকারি সুযোগ-সুবিধা স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী বিতরণ করায় পঞ্চায়েত ক্রমশ ‘এলেবেলে’ হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি, ‘দুয়ারে সরকার’ ‘পাড়ায় সমাধান’ প্রভৃতি কর্মসূচি পঞ্চায়েতকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি আধিকারিকদের কাছে পৌঁছতে উৎসাহ দিয়েছে গ্রামবাসীকে। গ্রাম পঞ্চায়েত স্থানীয় স্বশাসনের কার্যালয় থেকে পরিণত হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকারের শাখা দফতরে। গ্রাম সভার গুরুত্বও কমেছে। এলাকা উন্নয়নের কোন কাজটি আগে হবে, সরকারি আবাস কিংবা ভাতা কে আগে পাবে, তা সম্মিলিত আলোচনায় স্থির করার ক্ষমতা হারিয়েছেন গ্রামবাসী।
দুর্নীতি, অদক্ষতা, বিলম্ব— পঞ্চায়েত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ অনেক। অথচ, আধিকারিকদের নেতৃত্বে কেন্দ্রের আবাস যোজনার যোগ্য প্রাপক খুঁজতে গিয়ে চূড়ান্ত দুর্নীতি ঘটেছে। অন্যান্য রাজ্য থেকেও সাক্ষ্য মিলেছে যে আধিকারিকের ক্ষমতাবৃদ্ধি করলেই অপচয়, অব্যবস্থা কমে না। তৎপর, স্বচ্ছ ব্যবস্থার জন্য সরকার অবশ্যই আইন করে পঞ্চায়েতে পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু চেক কে সই করলেন, সেটা বড় কথা নয়; কাদের চাহিদা গুরুত্ব পেল, প্রশ্ন সেখানে। বিকেন্দ্রিত ব্যবস্থা বহু স্বর, বহু মত, বহু বিরোধিতার মধ্যেও কাজ করার একটি সূত্র বার করে। আইন করে ব্যবস্থা বদল করলেও, ওই সূত্রটির প্রয়োজন থেকেই যায়।