কথা কম, কাজ বেশি— এমন একটা কথা প্রচলিত। অযথা শব্দক্ষয় মূল্যহীন, বরং দরকারি কাজটি করলে আখেরে লাভ হবে— এমনই বলতে চায় সেই সমাজোপদেশ। তবে কাজের কাজটি করুন কি না-ই করুন, এই সময়ের মানুষ যে কথা সত্যিই কম বলছেন, দেখিয়ে দিচ্ছে গবেষণা। আমেরিকার মিজ়ৌরি-ক্যানসাস সিটি ইউনিভার্সিটি এবং অ্যারিজ়োনা ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞান-গবেষকদের লেখা বেরিয়েছে সম্প্রতি পার্সপেক্টিভস অন সাইকোলজিক্যাল সায়েন্স জার্নালে, তার নির্ণয়: প্রতি দিন মুখে বলা শব্দের গড় সংখ্যা বছরে কমছে প্রায় ৩৩৮টি করে। গবেষকরা ২০০৫-২০১৯— প্রায় পনেরো বছর ধরে, আমেরিকা ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়া জুড়ে ১০ থেকে ৯৪ বছর বয়সি মোট ২১৯৭ জনের দৈনন্দিন বলা কথার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন— এক জন গড় মানুষের কথা বলা প্রতি বছর ক্রমশ কমছে। প্রতি দিন জনপ্রতি প্রায় ৩৩৮টি শব্দ কম বলা মানে বছরে ১ লক্ষ ২০ হাজারেরও বেশি শব্দহীনতা। এ তো অঙ্কের হিসাব; মানসিক ও সামাজিক হিসাবটি গুরুতর— কথা বলার মধ্য দিয়ে মানুষে মানুষে যে সংযোগ, তার ক্ষয় ও ক্ষতির পরিমাণ কে মাপবে!
এই পরিসংখ্যান মূলত পশ্চিমি সমাজের তথ্যনির্ভর, গোটা পৃথিবীর মানুষের কথন-অভ্যাস সম্পর্কে একই সিদ্ধান্ত হয়তো টানা চলে না। দেশ ও সংস্কৃতি-ভেদে গড় মানুষের কথা বলার অভ্যাসে ভিন্নতা রয়েছে; কোনও কোনও জাতিগোষ্ঠীর বাক্স্ফূর্তি স্বভাবত বেশি, কেউ বা মিতভাষী। উল্লিখিত গবেষণায় এশিয়া বা আফ্রিকা মহাদেশের প্রসঙ্গ বিবেচিত হয়নি, হলে ফলাফল বা সিদ্ধান্ত নিশ্চিত ভাবেই অন্য রকম হত। তবু, সব পেরিয়েও বলা যায়, প্রাচ্য হোক বা পাশ্চাত্য, সাধারণ ভাবেও মানুষের কথার আয়ু ফুরিয়ে আসা কোনও শুভ সঙ্কেত নয়। মানবসভ্যতার ইতিহাসে কথার ভূমিকা কেবল ভাব বিনিময়ে সীমাবদ্ধ নয়। কথা দিয়েই গড়ে ওঠে সম্পর্ক, মেটে ভুল বোঝাবুঝি, তৈরি হয় সহমর্মিতা। কথা বলা মানে দুই বা অনেক মানুষের পরস্পর কাছে আসার অবকাশ। গূঢ় দার্শনিক আলোচনা, শিল্প-সংস্কৃতির তত্ত্ব, রাজনীতি-অর্থনীতির জটিল তর্কের কথা বলা হচ্ছে না, সে-সব সকল মানুষের অধিগত নয়, পছন্দেরও না। যে কথাগুলি হারিয়ে যাচ্ছে, তার সবই হয়তো এ-হেন গভীর আলোচনার অংশ ছিল না। দোকানে জিনিস কিনতে গিয়ে দু’টি অতিরিক্ত কথা, পথ জানতে অপরিচিত মানুষকে প্রশ্ন, প্রতিবেশীর সঙ্গে সিঁড়িতে দেখা হলে কুশল বিনিময়— এই সব অকিঞ্চিৎকর কথোপকথন সামাজিক জীবনের সেতুবন্ধ। এ থেকেই তৈরি হয় আস্থা, পরিচিতির বোধ, অন্যের মন বুঝতে শেখার অভ্যাস।
গবেষণা বলছে, পঁচিশ বছর বা তার কম বয়সিদের ক্ষেত্রে কম কথা বলার প্রবণতা তীব্রতর। এর একটা ব্যাখ্যা হতে পারে প্রযুক্তিগত: তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতিতে দূরত্ব কমেছে, যোগাযোগের গতি বেড়েছে। স্মার্টফোন, মেসেজ, ইমেল ও সমাজমাধ্যম এই পরিবর্তনের অনুঘটক। যে প্রশ্ন এক সময়ে মানুষকে মুখে বলে (বা হাতে লিখে) করতে হত, আজ তার উত্তর দেয় নানা অ্যাপ। যে সাক্ষাৎ ফোনালাপে পরিণত হতে পারত, তা সেরে ফেলা হচ্ছে টাইপ করা কয়েকটি শব্দে, ইমোজিতে। এমন নয় যে আধুনিক যোগাযোগ-প্রযুক্তি শুধু তরুণ-যুবদেরই করায়ত্ত, সব বয়স ও আর্থ-সামাজিক অবস্থানের মানুষই তা ব্যবহার করছেন কমবেশি। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের জেরেই যে মুখোমুখি বসে দু’দণ্ড কথা বলার অবকাশ নিশ্চিত ভাবে কমেছে, গবেষণা তা প্রমাণ করেনি; লিখিত যোগাযোগে মানুষের শব্দসংখ্যা কমেছে কি না, বা তার সামাজিক উপকার মুখের কথার সমান কি না, সেও অমীমাংসিত। তবু, এটা নিশ্চিত যে মুখের কথার আছে এক নিজস্ব ব্যাকরণ: কণ্ঠস্বরের ওঠানামা, সামান্য বিরতি, হাসি, দ্বিধা, এমনকি কথার মাঝে নীরবতা— এই সবই মানুষে মানুষে যোগাযোগের পথ। আবার এটাও সত্য, ডিজিটাল যোগাযোগ বহু দূরের মানুষকে কাছে এনেছে, একাকী বা প্রান্তিক মানুষের জন্য তৈরি করেছে নতুন সংযোগের পরিসর। প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তি বনাম মানুষ নয়; প্রযুক্তির মধ্যে মানুষ কতখানি মানুষের জন্য জায়গা রাখছে, তা। চেনা এবং অচেনা মানুষেরও সঙ্গে রোজ আপাত-অপ্রয়োজনীয় কিন্তু আন্তরিক কথা বলা, প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া, বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে কাটানো সময়ে অন্তত হাতের ফোনটি সরিয়ে রাখা— এই সবই তার ছোট কিন্তু জরুরি পদক্ষেপ। সভ্যতার অগ্রগতি শুধু দ্রুততম বার্তা পাঠানোর ক্ষমতায় নয়, অন্যের কথা শোনার ধৈর্যেও। আর কথা না বললে, শুনব কী ভাবে?