বছর তিনেক আগেই উত্তরকাশীতে নির্মীয়মাণ সিল্কিয়ারা-বারকোট টানেলের একটি অংশে ধস নেমে আটকে পড়েছিলেন ৪১ জন শ্রমিক। তাঁদের উদ্ধারকাজটি সহজ ছিল না। বহু প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দলও সমাধান সূত্র পেতে ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত ‘র্যাট হোল মাইনিং’ পদ্ধতির সাহায্যে ১৭ দিন পর ৪১ জন কর্মীই সুড়ঙ্গের বাইরে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। তিন বছর পর যেন সেই দুর্ঘটনারই পুনরাবৃত্তি দেখল সিকিম, যদিও পরিণতিটি এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ আলাদা। সিকিমের নামচিতে এনএইচপিসি-র তিস্তা স্টেজ-৬ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য নির্মীয়মাণ এডিট-৩ সুড়ঙ্গে সম্প্রতি ধস নামায় আটকে পড়েছিলেন বাস্তুকার, শ্রমিক-সহ অন্তত ২৭ জন। দু’জন কোনও ক্রমে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারলেও বাকিরা তা পারেননি, যাঁদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গেরও অনেকে ছিলেন। নিছক ভূমিধসের ঘটনা নয়, অনুমান করা হচ্ছে, খননকার্য চলার সময় পাথরের খাঁজে সঞ্চিত মিথেন গ্যাসে বিস্ফোরণের কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটে। বিষাক্ত মিথেন গ্যাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম এবং বদ্ধ জায়গায় তার সংস্পর্শে এলে তৎক্ষণাৎ মৃত্যু। এ ক্ষেত্রেও বিস্ফোরণে ঝলসে এবং বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে এতগুলি প্রাণহানি ঘটেছে।
যে কোনও দুর্ঘটনা-অন্তে যা ঘটে, এ ক্ষেত্রেও তার অন্যথা ঘটেনি— বিভিন্ন সরকারি স্তর থেকে ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু গভীর সুড়ঙ্গে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের বিপদের ঝুঁকি মাথায় রেখে তদনুযায়ী ব্যবস্থা করা হয় কি? এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে মেঘালয়ের এক বেআইনি কয়লা খনিতে বিস্ফোরণের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ৩০ জন শ্রমিক। উত্তরকাশীর সুড়ঙ্গ দুর্ঘটনায় তত্ত্বাবধায়ক সংস্থা এবং ঠিকাদারের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের কথা উঠে এসেছিল। অভিযোগ উঠেছিল, মাটির অভ্যন্তরের অবস্থা বোঝার জন্য উপযুক্ত সেন্সর এবং যন্ত্রপাতি সেখানে ছিল না। ঘটনাগুলির পরিপ্রেক্ষিত এক না হলেও গাফিলতি-চিত্রটি সব ক্ষেত্রেই সমান প্রকট। তিস্তা উপত্যকার মতো ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন অঞ্চলে খননকার্যের সময় পাথরে জমে থাকা মিথেনের উপস্থিতি অপ্রত্যাশিত নয়। তার বিপদটিও নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞদের অজানা নয়। একটি রিপোর্টে এমনও দাবি করা হয়েছে যে, পূর্বেও সুড়ঙ্গগুলিতে দাহ্য গ্যাসের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও সতর্কতা নেওয়া হয়েছিল কি?
সিকিম হিমালয়ের ভূপ্রকৃতিগত ভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলে অবস্থিত। ঘন ঘন ভূমিধসের ঘটনা, ভূকম্পপ্রবণতা, ভঙ্গুর পাথুরে জমি, এবং হিমবাহ গলা জলে পুষ্ট হ্রদ ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনাপূর্ণ অঞ্চলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলার বিপদ নিয়ে বহু বার সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু সরকারি স্তরে তাতে কর্ণপাত করা হয়নি। নির্মাণ কাজ যদি অত্যাবশ্যকও হয়, তা হলেও উপযুক্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা, নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং বিপদ ঘটলে দ্রুত উদ্ধারের ব্যবস্থা অনেক প্রাণহানি রোধ করতে পারে। এই সমস্ত শর্ত সিকিমে আদৌ মানা হয়েছিল কি? এই দুর্ঘটনার বিস্তারিত তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে সিকিম সরকার। সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভাবে সেই তদন্ত চালনা করা, গাফিলতির খোঁজ পেলে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান এবং এই অভিজ্ঞতাকে ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা রোধে ব্যবহার করা— এ ব্যতীত শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিধান অসম্ভব। শুধুমাত্র ক্ষতিপূরণের ঘোষণা এতগুলি প্রাণের বিকল্প হতে পারে না।