মহাজীবনসূত্রে এক-একটা দিন ইতিহাসে গেঁথে যায়— বাইশে শ্রাবণ, পঁচিশে বৈশাখ যেমন। আবার বর্তমান সব সময় ফিরে দেখতে চায় অতীত: এ কালের বাইশে শ্রাবণে কারও মনে হতে পারে— একশো বছর আগের শ্রাবণে কোথায় ছিলেন, কী করছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ২০২৬-এ কোনও রবীন্দ্রজিজ্ঞাসু ভাবতে পারেন, ১৯২৬-এ কেমন কাটছিল কবির জীবন। এই ফিরে দেখার প্রক্রিয়ায় অনেক সময়েই বেরিয়ে পড়ে হারানিধি— গবেষকের হয়তো চেনাজানা, কিন্তু সাধারণ্যে তা আবিষ্কারের সমতুল। জানা ঘটনা থেকেও, বর্তমান সময় ও বাস্তবতার বিচারে অনেক সময় ঝলকে ওঠে অন্য আলো। ১৯২৬-এ রবীন্দ্রনাথের ইউরোপ-সফর যেমন বহুচর্চিত প্রসঙ্গগুলির একটি, তেমনই মনে রাখা দরকার: সে-বছরেই, ইউরোপ-যাত্রারও আগে এক পক্ষকাল তিনি ঘুরে এসেছিলেন ঘরের কাছে পূর্ববঙ্গে, প্রধানত ঢাকায়। আজকের বাংলাদেশে সে-ইতিহাস যত চর্চিত, পশ্চিমবঙ্গে ততটাই কি না, এ-প্রশ্ন অসঙ্গত নয়।
১৯২৬-এর ৭-২২ ফেব্রুয়ারি পূর্ববঙ্গের নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা, ময়মনসিংহ, কুমিল্লার নানা জায়গায়, নানা সঙ্ঘ, সংগঠন, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রবীন্দ্র-সংযোগের এই পর্ব ধরা আছে নানা ভাবে; আনন্দবাজার পত্রিকা-সহ নানা সংবাদপত্রের রিপোর্টিংয়ে, বুদ্ধদেব বসু-ভবতোষ দত্ত-কাজী মোতাহার হোসেনের লেখায়, রমেশচন্দ্র মজুমদারের স্মৃতিকথায় (মুখ্যত তাঁর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আহ্বানেই রবীন্দ্রনাথের ঢাকা যাওয়া), এবং অবশ্যই পরবর্তী কালে এ নিয়ে বিশদ লেখালিখিতে: প্রশান্তকুমার পাল থেকে আবুল ফজল গোপালচন্দ্র রায় সৈয়দ আবুল মকসুদ প্রমুখ আলো ফেলেছেন সেখানে। এমন নয় যে রবীন্দ্রনাথ আগে ঢাকা যাননি, ১৮৯৮-এ বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনের অধিবেশনে ঢাকায় বক্তৃতা করেছেন, গানও গেয়েছেন, কিন্তু তাঁর ১৯২৬-এর ঢাকা-সফরের গুরুত্ব আলাদা— নোবেলজয়ী বিশ্বকবিকে পূর্ববঙ্গের আম-বাঙালি স্বচক্ষে দেখার, সামনে থেকে তাঁর কথা শোনার সুযোগ পেয়ে ধন্য হয়েছিল। বুড়িগঙ্গার জলে ঢাকার নবাবের ‘তুরাগ’ স্টিমলঞ্চের ডেক-এ বিশ্রামরত কবিকে দেখেছেন ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের ছাত্র বুদ্ধদেব বসু, ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে কবির সামনে অভিনন্দনপত্র পাঠ করেছেন কিশোর ভবতোষ দত্ত, কাজী মোতাহার হোসেন মুসলিম হল-এ রবীন্দ্রকণ্ঠে শুনেছেন গান ‘বেলা গেল তোমার পথ চেয়ে’, জগন্নাথ হল-এর ছাত্রদের পত্রিকার জন্য কবি লিখে দিয়েছেন: ‘এই কথাটি মনে রেখো, তোমাদের এই হাসিখেলায়/ আমি যে গান গেয়েছিলেম, জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায়।’ ঢাকায় নবাবের টি-পার্টি থেকে দীপালি সঙ্ঘের আয়োজনে প্রায় দু’হাজার মেয়েদের সমাগমেও ছিলেন তিনি, বিশ্বভারতী সম্মিলন থেকে বলধার জমিদারের উদ্যানও (এখন যা বলধা গার্ডেন নামে খ্যাত) ঘুরে দেখেছেন। রবীন্দ্রসান্নিধ্যধন্য এই সব জায়গা— বুড়িগঙ্গা নদী থেকে ঢাকার নানান অট্টালিকা, উদ্যান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ছাত্রাবাস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল— আজও সেই ঐতিহাসিক স্মৃতি ধরে আছে।
এ-সব পেরিয়েও কথা বলা দরকার সেই বক্তৃতাগুলি নিয়ে, শতবর্ষ পূর্বের ঢাকাবাসী যা শুনেছেন রবীন্দ্রনাথের মুখে। উপলক্ষ, উদ্যোগ ও দর্শকচরিত্র বুঝে, কখনও সংক্ষিপ্ত, আবার কখনও সুদীর্ঘ ভাষণে তিনি অবতারণা করেছেন সেই সব প্রসঙ্গ— একশো বছর পরেও ফিরে পড়লে যাদের প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্য আমাদের আশ্চর্য করে। ঢাকার মেয়েদের সামনে বলেছেন, তাঁর কাব্যের রসগ্রহণে এদেশের মেয়েদের বাধা ঘটেনি কারণ মেয়েদের মধ্যে আছে ‘সহজবোধের ঐশ্বর্য’; তাকে অভিনন্দিত করে বলেছেন, ‘যাও বাহিরে, বিশ্বকে আহ্বান কর’। জগন্নাথ ইন্টারমিডিয়েট কলেজের সভায় পাঁচ হাজার মানুষের সামনে তাঁর ঘণ্টা দেড়েকের সুদীর্ঘ বক্তৃতা সম্পর্কে আনন্দবাজার পত্রিকা-য় লেখা হয়েছিল, “তাঁহার বক্তৃতায় তিনটি অতি দুরূহ সমস্যার সুমীংসার কথা ছিল— (১) হিন্দু-মুসলমান সমস্যা, (২) অস্পৃশ্য জাতির প্রতি আমাদের কর্তব্য (৩) পল্লী সংস্কার।” আবার কার্জন হল-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবগম্ভীর আয়োজনে পড়েছেন ইংরেজি প্রবন্ধ, ‘দ্য মিনিং অব আর্ট’, ‘দ্য রুল অব দ্য জায়ান্ট’। একশো বছর আগের বাঙালি সমাজ, রাজনীতি, ধর্ম, ভাষা-সাহিত্য, শিল্প-সংস্কৃতির সমস্যা, সঙ্কট ও সমাধান-সম্ভাবনা নিয়ে কী ভাবছিলেন মধ্য-ষাটে পৌঁছনো কবি ও চিন্তক রবীন্দ্রনাথ, তার বিশদ পরিচয় ছড়িয়ে আছে এই ঢাকা তথা পূর্ববঙ্গ সফরে। একই বছরে তাঁর ইউরোপ-ভ্রমণ জুড়ে যে বৃহৎবোধের পদচারণা, তার মূলসুরটি যেন বাঁধা হয়ে গিয়েছিল— ঘরের কাছেই।