ঘাটতি দিয়ে শুরু হয়েছিল এই বছরের জুন। জুলাই মাসে ভারতে বর্ষার সেই ঘাটতি অনেকটাই পুষিয়ে গিয়েছে ঠিকই, কিন্তু বিপদ কাটেনি। বিশেষজ্ঞদের রিপোর্টে জানা গিয়েছে, অগস্ট থেকে এক প্রবলতর এল নিনিয়োর প্রভাব ঠেলে তুলবে তাপমাত্রাকে, পাল্টে দেবে মরসুমি বৃষ্টির ধরন। এবং সর্বাপেক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলির অন্যতম হবে ভারত। এই দুঃসংবাদ শুনিয়েছে বিশ্বের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ সংস্থা ডব্লিউএমও। তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, এই বছরের অগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকবে তাপমাত্রা। ইঙ্গিত মিলেছে কম বৃষ্টিপাতেরও। নিঃসন্দেহে বর্ষার বৃষ্টিপাতের উপর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাবে প্রবল নির্ভরশীল দেশের পক্ষে এই তথ্য ঘোর দুঃসংবাদ। এল নিনিয়ো এক বিশেষ প্রাকৃতিক অবস্থা। তাকে নিয়ন্ত্রণ করার চাবিকাঠি এখনও বিজ্ঞান অর্জন করতে পারেনি। কিন্তু যা নিয়ন্ত্রণযোগ্য ছিল, তাকেও কি ক্ষমতাসীনরা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছেন? উপরোক্ত রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আন্তোনিয়ো গুতেরেসের উক্তিটি তাই অগ্রাহ্য করা চলে না। তিনি বলেছেন— যে গ্রহ ইতিমধ্যেই দগ্ধ হচ্ছে তীব্র তাপপ্রবাহ, ভয়ঙ্করতম দাবানল আর রেকর্ডভাঙা উষ্ণ সমুদ্রের জলকে সঙ্গী করে, শক্তিশালী এল নিনিয়ো তাতেই জ্বালানি সংযোগের কাজটি করল। এই অসহনীয় পরিস্থিতির জন্য তিনি জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার-বৃদ্ধিকেও সমান ভাবে দায়ী করেছেন।
কেন এত ঘন ঘন শক্তিশালী এল নিনিয়ো আগমন— এ নিয়ে নানাবিধ আলোচনা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশ এর জন্য বিশ্ব উষ্ণায়নকে দায়ী করলেও সরাসরি উভয়ের মধ্যে যোগসূত্রের বিষয়টি এখনও প্রমাণিত নয়। তবে অনস্বীকার্য যে, উষ্ণায়নের কারণে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি শিল্পবিপ্লব-পূর্ববর্তী যুগের তুলনায় ইতিমধ্যেই প্রায় দেড় ডিগ্রি স্পর্শ করেছে। ইউরোপের শীতপ্রধান দেশগুলি গ্রীষ্মকালে অস্বাভাবিক গরমে পুড়ছে, মৃত্যু হচ্ছে অসংখ্য মানুষের। উপকূলবর্তী অঞ্চলে নিয়মিত হানা দিচ্ছে অতি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, অসময়ের বন্যায় ধুয়ে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ অঞ্চল— এ সবই চরম আবহাওয়াজনিত বিপর্যয়ের লক্ষণ, যার পিছনে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর এখনও অত্যধিক নির্ভরতার কারণটি ইতিমধ্যেই প্রমাণিত। প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি সেই অসহনীয়তাকেই এই বছর আরও অনেকটা বাড়িয়ে তুলবে, অবধারিত ভাবে।
ভারতের জন্য এই পরিস্থিতি সবিশেষ দুশ্চিন্তার। কৃষিক্ষেত্র তো বটেই, একই সঙ্গে ধাক্কা খাবে ভারতের শক্তি উৎপাদন ক্ষেত্রটিও। কম বৃষ্টিপাতের কারণে জলবিদ্যুতের মতো পরিবেশবান্ধব শক্তি উৎপাদন ব্যাহত হবে। আবার, অত্যধিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি করবে বলে জীবাশ্ম জ্বালানি-নির্ভর দেশে আরও বাড়বে কয়লা পোড়ানোর মাত্রা, যা পরিণামে আরও দূষিত করবে পরিবেশকে। তবে, আবহবিদদের একাংশ এমনও জানাচ্ছেন, তাপমাত্রা বাড়লেও আগামী মাসগুলিতে বৃষ্টিপাত উল্লেখযোগ্য ভাবে না-ও কমতে পারে। কারণ, ভারত মহাসাগরের ডাইপোল (আইওডি) পর্যায়, যা ভারতের দিকে জলীয় বাষ্প ঠেলে বৃষ্টি আনতে পারে। আবহবিদদের মতে, এল নিনিয়োর পাশাপাশি আইওডি-ও বৃদ্ধি পেতে পারে। জিতবে কে, দেখা যাক।