E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

শূন্য আসন

নীতি বলছে, ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে ‘উন্নয়নশীল’ থেকে ‘উন্নত’ দেশ করতে হলে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৮-২৩ বছর বয়সিদের অন্তত ৫০ শতাংশকে উচ্চশিক্ষায় নথিভুক্ত করতে হবে। এই লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে সাত বছরের মধ্যে আট কোটি ছাত্রছাত্রীকে উচ্চশিক্ষায় আনা প্রয়োজন।

শেষ আপডেট: ১৫ জুলাই ২০২৬ ০৬:৩৮

কলেজগুলিতে শূন্য আসনের সংখ্যা শিক্ষকদের কপালে দীর্ঘ দিনই ভাঁজ ফেলেছে, এ বার পাওয়া গেল সর্বভারতীয় পরিসংখ্যান। অল ইন্ডিয়া সার্ভে অন হায়ার এডুকেশন, ২০২২-২৩ এবং ২০২৩-২৪ পাশাপাশি রেখে দেখা যাচ্ছে, এক বছরে স্নাতক স্তরে প্রায় এক লক্ষ শিক্ষার্থী কমেছে। পাঁচ বছরে এই প্রথম স্নাতক স্তরে নথিভুক্তির এই নিম্নমুখী ধারা দেখা গেল। কেন কলেজে আগ্রহ হারাচ্ছেন ছাত্রছাত্রীরা, তার কারণ নিয়ে কাটাছেঁড়া শুরু হয়েছে। অনেকেই হতাশার কারণ দেখছেন না। তাঁরা মনে করছেন, কাজের বাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এত দিন যে ভাবে কলেজশিক্ষা চলে আসছিল, তা যে স্নাতকদের নিয়োগের সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে না, তা নিয়ে এখন সজাগ হয়েছে তরুণ প্রজন্ম। একাধিক বেসরকারি সমীক্ষাও দেখিয়েছে যে ভারতের কলেজ-পড়ুয়াদের অর্ধেকও কাজের বাজারে নিয়োগযোগ্য নয়। অর্থহীন ডিগ্রির জন্য জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট না করে ছাত্রছাত্রীরা বেছে নিচ্ছেন হাতে-কলমে কাজ শিখে নেওয়ার নানা পাঠক্রম। জাতীয় শিক্ষা নীতি (২০২০) স্কুল থেকেই নানা ধরনের দক্ষতায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। দশম অথবা দ্বাদশ শ্রেণির পরেও পেশাগত প্রশিক্ষণের নানা স্বল্পমেয়াদি পাঠক্রম চালু হয়েছে। যাঁরা স্নাতক পাঠক্রমে নাম লেখাচ্ছেন, তাঁরাও দু’-তিন বছর পড়াশোনার পরে সার্টিফিকেট কিংবা ডিপ্লোমা নিয়ে কলেজ ছাড়ছেন। তাই চতুর্থ বছরে অধিকাংশ আসন খালি থাকছে। অতএব যাকে মনে হচ্ছে উচ্চশিক্ষায় ঘাটতি, নিয়োগচিত্রের দিক দিয়ে দেখলে তা হয়তো লাভজনক— অকারণ সময় ও সম্পদের ক্ষতি এড়াতে পারলে তাতে ব্যক্তি ও সরকার, উভয়েরই লাভ। গত দশ বছরে ভারতে ছ’শোরও বেশি এঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বন্ধ হয়ে গিয়েছে, যার প্রধান কারণ প্রযুক্তিতে পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পে চাহিদার পরিবর্তন। শিল্প, পরিষেবার ক্ষেত্রে নিয়োগের শর্ত বদলাচ্ছে। কলেজ তাল রাখতে না পারলে উঠে যাওয়াই বাঞ্ছনীয়।

চাহিদা-জোগানের এই তত্ত্ব মেনে নিলে নিশ্চিন্তে থাকা যায়, কিন্তু জাতীয় শিক্ষা নীতি (২০২০) তার সুযোগ দিচ্ছে কই? নীতি বলছে, ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে ‘উন্নয়নশীল’ থেকে ‘উন্নত’ দেশ করতে হলে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৮-২৩ বছর বয়সিদের অন্তত ৫০ শতাংশকে উচ্চশিক্ষায় নথিভুক্ত করতে হবে। এই লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে সাত বছরের মধ্যে আট কোটি ছাত্রছাত্রীকে উচ্চশিক্ষায় আনা প্রয়োজন। তার জন্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত তিন কোটি নতুন আসন তৈরি করতে হবে। বর্তমানে স্নাতক থেকে পিএইচ ডি, সব স্তর মিলিয়ে নথিভুক্তদের মোট সংখ্যা সাড়ে চার কোটি, যা ভারতের ১৮-৩০ বছর বয়সিদের মাত্র ৩০ শতাংশ, যেখানে চিন, ব্রাজ়িল, রাশিয়ার মতো দেশে ওই অনুপাত ৬০ শতাংশ। কৃত্রিম মেধার যুগে শিল্পে মুখস্থবিদ্যার বদলে বিশ্লেষণ-ক্ষমতা, সৃজনশীলতায় অভিনবত্বের প্রয়োজন বেড়েছে। তার উপযুক্ত শিক্ষা দিতে হবে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে।

কিন্তু সেই শিক্ষা পাবে কারা? কলেজের শূন্য আসন কতটা ছাত্রছাত্রীদের অনাগ্রহের জন্য, আর কতটা অপারগতার জন্য, তার উত্তর এখনও মেলেনি। কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে অসাম্যের ছবিটা স্পষ্ট হচ্ছে। এক দিকে সংখ্যালঘু, তফসিলি জাতি ও জনজাতির জন্য স্কলারশিপের টাকা কমেছে, অন্য দিকে উচ্চশিক্ষার বেসরকারিকরণ অব্যাহত— ভারতে এখন দশটি কলেজের সাতটিই বেসরকারি মালিকানায়, অথবা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় কাজ করছে। পাশাপাশি নয়া শিক্ষা নীতি স্নাতক শিক্ষার মেয়াদ চার বছর করেছে, যার ফলে শিক্ষার খরচ বেড়েছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীর ঘাটতি অনেকটাই স্বল্পবিত্ত পরিবারগুলির সামর্থ্যে ঘাটতি। শিক্ষা নীতির ঘোষিত উদ্দেশ্য যা-ই হোক, শেষ অবধি স্বল্পমেয়াদি শিক্ষা দরিদ্রের, আর উচ্চশিক্ষা-গবেষণা বিত্তবানের, এই নকশা দেশব্যাপী। কলেজের শূন্য আসন যদি মানবসম্পদের অপচয়ের সূচক হয়, তবে তা দুশ্চিন্তার বিষয় বই কি।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Higher education Students Indian Education System Undergraduate Courses Undergraduate Undergraduate Admission

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy