এক সপ্তাহের মধ্যে, এমনকি একই দিনে একটি রাজ্যের আলাদা আলাদা জায়গায় একই ধরনের ঘটনা ঘটলে তাদের বিক্ষিপ্ত বলা চলে কি না, প্রশ্ন ওঠে। সেই প্রশ্নই ওঠাল রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার একটি ওয়র্ডে নির্মীয়মাণ গির্জায় ভাঙচুর, বিশেষত গির্জার মাথায় উঠে ক্রুশচিহ্ন ভাঙা, যার অপ্রীতিকর সংবাদ সমাজমাধ্যম ও প্রচারমাধ্যম সূত্রে সামনে এসেছে। একই দিনে পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়ায় একটি গির্জায় প্রার্থনাকালীন হামলা, ভাঙচুর, নগদ অর্থ ও অন্যান্য সামগ্রী লুট হয়েছে। তার আগের দিন পশ্চিম মেদিনীপুরে একটি আন্তর্ধর্মীয় বিবাহের প্রার্থনা-অনুষ্ঠানে উপস্থিত মহিলাদের উপর চড়াও হওয়ার খবর এসেছে। স্থাননামগুলি আর এক বার নজর করে দেখা যেতে পারে: কেননা উত্তরপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ় বা মধ্যপ্রদেশ নয়, এগুলি পশ্চিমবঙ্গের ঘটনা— রাজনৈতিক দল ও জমানা-নির্বিশেষে যে রাজ্যে সংখ্যালঘু খ্রিস্টানদের এ ভাবে আক্রান্ত হওয়া অবিশ্বাস্য।
রাজনৈতিক পালাবদলই এই আক্রমণের হেতু, রাজ্যে ক্ষমতাসীন বিজেপিই উগ্র হিন্দু জনতাকে দিয়ে এই সব করাচ্ছে— এই অভিযোগ ও ক্ষোভের সারবত্তা নিয়ে তরজায় মেতে ওঠা সঙ্গত কাজ নয়। আসল প্রশ্ন, যে দলই সরকার চালাক না কেন, তাদের শাসনে একটি ধর্মগোষ্ঠীর মানুষের প্রার্থনাস্থল ও ধর্মাচরণের নিগ্রহ হবে কেন, তাঁদের নিজস্ব উৎসব-অনুষ্ঠানে হাত পড়বে কোন যুক্তিতে। প্রশ্নটি এক দিকে যদি হয় ধর্মাচরণের স্বাধীনতার, অন্য দিকটি তবে একান্ত ভাবেই আইনের শাসন ও নিয়মশৃঙ্খলা রক্ষার। প্রথমটি ভারতের সংবিধানমতে অবিসংবাদিত, দ্বিতীয়টি নিয়েই বরং এ ক্ষেত্রে কথা বলা দরকার: যে পুলিশের কাঁধে আইনশৃঙ্খলার ভারটি ন্যস্ত, তারা কী করছিল? উপরের ঘটনাগুলিতে প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুলিশের কাজ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে— নিগৃহীতের অভিযোগ নিতে বা হামলাকারীদের আটক করতে গড়িমসি, ক্ষমতাশালী নেতার হস্তক্ষেপে ধৃতদের ছেড়ে দেওয়া, উল্টে খ্রিস্টান যাজককেই হেফাজতে নেওয়া ইত্যাদি। সরকার বদলালেও পুলিশের ভূমিকাটি অপরিবর্তিত, এ-ই কি বুঝতে হবে তবে? আক্রান্তের নয়, আক্রমণকারীর রক্ষণই শেষ কথা হয়ে উঠবে?
দক্ষিণ ২৪ পরগনায় গির্জা ভাঙার ঘটনায় আক্রমণকারীদের পরিচয়সূত্রে উঠে এসেছে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের নাম। তাদের তরফে পাল্টা অভিযোগও শোনা গেছে: অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্মান্তরণ চলছে, অথবা গির্জা নির্মাণের প্রক্রিয়াটি অবৈধ, ইত্যাদি। এই অভিযোগ তোলার যেমন একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে, তার নিষ্পত্তির জন্যও উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ রয়েছেন— পুলিশ, প্রশাসন, আদালত রয়েছে। এদের বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে, দলবল জুটিয়ে সংশ্লিষ্ট স্থানে চড়াও হয়ে ভাঙচুর, লুটপাট, হুমকি, মারধর— এর কোনও কিছুই যে করা চলে না, এই বার্তাটি গোড়াতেই পুলিশ-প্রশাসনের তরফে স্পষ্ট করে দেওয়া প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার, এ ক্ষেত্রে তা হয়নি, কিংবা হয়েছে নিগ্রহ ও ক্ষয়ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পরে, বিস্তর টালবাহানা পেরিয়ে। পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রতি উগ্র হিংস্র জনতার আক্রমণের ঘটনা ক্রমবর্ধমান, আক্রান্তের পরিচয় বদলে বদলে যাচ্ছে শুধু— আজ রাজনীতিবিদ তো কাল সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বী, তারও পরের দিন সাধারণ নাগরিক। আইন নিজেদের হাতে তুলে নিয়ে হাতে-গরম ‘শাসন’ ও ‘বিচার’ করার এই ভয়ঙ্কর প্রবণতা রোধ করতে প্রশাসন অবিলম্বে সক্রিয় হোক।