যা হওয়ার কথা ছিল তুরুপের তাস, তা-ই যেন গলার ফাঁস হয়ে উঠতে চাইছে। অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে বিজেপি নেতা-কর্মীদের অস্বস্তি তাই উঠে এসেছে সংবাদের শিরোনামে। শীর্ষ নেতারা যতই ঘোষণা করুন যে প্রাপক-সংখ্যা প্রতি মাসে বাড়ছে, তালিকার যাচাই জোরকদমে চলছে, ভরসা ফিরছে না। বিজেপিকর্মীরা ভোটের আগে ‘মাতৃশক্তি’ ফর্ম পূরণ করিয়েছিলেন, ভোটের পরে সরকার অন্নপূর্ণা যোজনার বারো পাতার ফর্ম বিলি করেছেন। তার পরেও দেরি কিসের? এই প্রশ্নের কী উত্তর দেওয়া যায়, কী করে ক্ষোভ প্রশমিত করা যায়, তা নিয়ে শাসক দলের মধ্যে আলোচনা চলছে। বিজেপি নেতা-কর্মীরা যা প্রকাশ্যে স্বীকার করতে চাইবেন না, কিন্তু রাজনৈতিক উপলব্ধিতে যা ধরা পড়তে বাধ্য, তা এই যে অন্নপূর্ণা যোজনার মতো অনুদানের প্রকল্প থেকে রাজনৈতিক আনুগত্য লাভের আশা ক্রমশই ক্ষীণ হয়ে আসছে। যদি বা কয়েক মাসের মধ্যে অধিকাংশ আবেদনকারীর নাম প্রাপক তালিকায় উঠে যায়, তা হলেও সন্দেহ, সংশয় ঘুচে গিয়ে কৃতজ্ঞতার উদয় হবে, তার আশা কতটুকু? বরং পুরসভা, পঞ্চায়েত থেকে লোকসভা— আগামী নির্বাচনগুলির আগে বিজেপি নেতা-মন্ত্রীরা যে সব প্রতিশ্রুতি দেবেন, সেগুলি ভোটদাতাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা কঠিন হয়ে উঠবে দলীয় কর্মীদের কাছে।
অন্নপূর্ণা প্রকল্পের শর্তে অস্বচ্ছতা, আবেদন প্রক্রিয়ায় হয়রানি এবং যাচাইয়ে বিলম্ব অনাস্থার কারণ তো বটেই, কিন্তু কেবলমাত্র সেগুলিই কারণ নয়। সাধারণ নাগরিক, বিশেষত দরিদ্র, প্রান্তিকদের নানা ধরনের প্রয়োজনের স্বীকৃতি, তাদের প্রতি শাসক দলের সংবেদনশীলতা থাকার কথা ছিল এই সরকারি প্রকল্পগুলিতে। তার বদলে এ হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজ কর্মসূচি। তালিকা নির্মাণে আমলাতান্ত্রিকতা গেড়ে বসলে দল ও নাগরিকের সংযোগ শিথিল হতে বাধ্য। উপরন্তু, অন্নপূর্ণায় অব্যবস্থার একটি বৃহত্তর প্রেক্ষিত রয়েছে— ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন, বা এসআইআর। সব তথ্যের জোগান দিয়েও সরকারের তালিকায় স্থান না পাওয়া, কোনও কারণ ছাড়াই নাগরিকের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার এক ভয়ানক নিদর্শন নির্মিত হয়ে রয়েছে দেশের সামনে। এত দিনে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে সরকারের তথ্যের ক্ষুধা অসীম, আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড, জমির দলিল থেকে চোখের তারা, আঙুলের ছাপ, তথ্যের পর তথ্য জুগিয়েও সরকারের তথ্য-তলবের সীমা মেলে না। অন্য দিকে সেই সব তথ্যই মিলিয়ে যায় প্রশাসনের কোনও এক তলহীন তথ্যভান্ডারে। তা থেকে নির্গত হয় না নাগরিকের অধিকারের সুরক্ষা, অমর্যাদার নিরসনের কোনও সূত্র। নির্মিত হয় না জনকল্যাণের কোনও নীতি। কেবলই পরিচয়ের পরীক্ষা দিতে দিতে মানুষ হয়রান। কখনও তা পেশাগত পরিচিতির পরীক্ষা, কখনও নাগরিকত্বের, কখনও আর্থিক অবস্থার। এসআইআর-এর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে যে ঝড় উঠেছে, তা থেকে এই সংশয়ও ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে যে আধিকারিকরা বিধি-নির্দিষ্ট পথে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না, বড় হয়ে উঠছে কোনও অদৃশ্য অঙ্গুলির নির্দেশ।
অন্নপূর্ণা প্রকল্প নিয়ে তাই সংশয় গাঢ় হচ্ছে। বিধায়কের দফতরে সহায়তা, ‘সেবা সেতু অভিযান’ জনকল্যাণ শিবির, কোনও ব্যবস্থাই ক্ষোভ, উত্তেজনা সামাল দিতে পারছে না। এটা ঠিক যে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মধ্যে সম্ভাবনার যে ধূসর জমি, তা-ই নির্বাচনী রাজনীতির ক্ষেত্র। তা সত্ত্বেও কিছু মৌলিক বিষয় সেই ধূসর বৃত্তের বাইরেই থেকেছে বরাবর। যেমন, নাগরিকের ভোটাধিকার, খাদ্য ও আবাসের জোগান, দরিদ্র মেয়েদের সহায়তা। এ সব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সুরক্ষা-বলয়কে আরও মজবুত করার প্রতিযোগিতাই এত দিন ছিল নির্বাচনী খেলা। তাই নতুন নতুন সহায়তার প্রকল্প ঘোষণা করেছে নানা দল। এখন সেখানেও শুরু হয়েছে দলীয় রাজনীতির হাতসাফাইয়ের খেলা, এই আশঙ্কা ক্রমেই গভীর হচ্ছে।