অসাম্যের ক্ষত যে সব উপায়ে প্রকাশ পায়, তার অন্যতম হল খিদে। ভারত এখন বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনীতি, কখনও কখনও পঞ্চম বা চতুর্থ স্থানেরও দাবিদার হয়েছে। কিন্তু ক্ষুধার সূচকে ভারতের স্থান নিরানব্বইটি দেশের পিছনে। গত বছরের অবস্থান (১০২) থেকে খানিক উন্নত বটে, কিন্তু এখনও ‘গুরুতর ক্ষুধা’ শ্রেণির বাইরে বেরোতে পারেনি ভারত। যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি এই সূচক প্রকাশ করে, তাদের পরিমাপ থেকে দেখা যাচ্ছে যে ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে ভারতের ‘স্কোর’ ২০০০ সালে ৩৮.১ থেকে ২০২৬ সালে ২৪.১-তে এসেছে। শ্রীলঙ্কা একই সময়ে ২১.৪ থেকে উন্নীত হয়েছে ১০.৪ অবস্থানে, চিন ১৩.৪ থেকে পাঁচেরও নীচে। যা ফের স্পষ্ট করে, বিশ্বায়িত অর্থনীতির সুবিধে ভারতের অধিকাংশ মানুষের কাছে পৌঁছতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। অতি মন্থর গতিতে অতি সামান্য পরিবর্তনকে ‘উন্নতি’ বলা চলে না, বিশেষত যেখানে বিলম্বের মূল্য চোকাতে হচ্ছে শিশুদের। ২০২৬ সালের বিশ্ব ক্ষুধা সূচক মেপেছে চারটি বিষয়— অপুষ্টি, শিশুদের খর্বাকৃতি (স্টান্টিং), শিশুদের দৈর্ঘ্যের তুলনায় ওজনে ঘাটতি এবং পাঁচ বছরের কমবয়সি শিশুদের মৃত্যুহার। ফলাফলে প্রকাশ, ভারতে জনসংখ্যার প্রায় দশ শতাংশ অপুষ্টিতে ভুগছে; পাঁচ বছরের কমবয়সি শিশুদের ২৯ শতাংশ অপুষ্টির ফলে খর্বাকৃতি, ১৯ শতাংশ শিশু রোগা— অর্থাৎ দৈর্ঘ্যের তুলনায় তাদের ওজন কম, এবং ২.৭ শতাংশ শিশু পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মারা যায়। ২০০০ সালে শিশুদের খর্বাকৃতির হার ৫০ শতাংশ ছিল। তা ছাড়া তিন জনে এক জন শিশু অপুষ্ট, এ ছবিও স্বস্তিকর নয়।
অপুষ্টির এই লজ্জাজনক ছবি তুলে ধরলেই সরকারের তরফে দেওয়া হয় কিছু পাল্টা পরিসংখ্যান— ৮০ কোটি নাগরিক রেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে সুলভে চাল-গম পাচ্ছে, শিশুরা অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে খাবার পাচ্ছে, স্কুলে মিড-ডে মিল পাচ্ছে, ইত্যাদি। এ ভাবে শিশুর দৈহিক-মানসিক বৃদ্ধির প্রশ্নটিকে কেবলমাত্র কয়েকটি প্রকল্পের পরিধিতে টেনে আনা হয়। তাতে আড়ালে পড়ে যায় পরিবারের কর্মহীনতা, কাজের অনিশ্চয়তা, সামান্য মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব। অথচ, শিশু পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার পেল কি না, তা প্রধানত এগুলির উপরেই নির্ভর করে। বিশেষত দরিদ্র মাকে সামান্য আয়ের জন্য প্রচুর পরিশ্রম করতে হলে তা শিশুর জীবনে নানা ভাবে ছাপ ফেলে যায়। রোজগারে বৈষম্য থেকে যাচ্ছে, আয়বৃদ্ধিকে বহুগুণ ছাড়িয়ে যাচ্ছে খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, দরিদ্র পরিবারের উপর এগুলির অভিঘাত সামাল দিতে পারছে না সরকারি প্রকল্প। নীতি আয়োগ শিশু পুষ্টির প্রধান নির্ধারক হিসেবে চিহ্নিত করেছে দারিদ্র, আয়ের অসম বণ্টন, মায়ের শিক্ষার হার এবং নারীর সামাজিক অবস্থানকে। কিন্তু পুষ্টি-বিধানের সরকারি উদ্যোগে এই সামগ্রিক চিন্তার ছাপ খুঁজে পাওয়া কঠিন।
অতএব ফের প্রশ্ন করা দরকার, খাদ্য জোগানোর প্রকল্পগুলি দীর্ঘ দিন চলার পরেও কেন শিশু-অপুষ্টির চিত্রে পরিবর্তন আসেনি? মিড-ডে মিল-এ বাড়তি বরাদ্দের আস্ফালন যথেষ্ট নয়, সেই বরাদ্দে শিশুর প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ফল, আনাজপাতি থাকছে কি না, শিশুরা দিনে একবার সুষম আহার পাচ্ছে কি না, তা দেখতে হবে। অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলি দীর্ঘ দিন অবহেলিত। পরিকাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন, মা ও শিশুর জন্য রুচিকর, পুষ্টিকর খাবারের জন্য যথেষ্ট টাকা বরাদ্দ করা দরকার। নজর দেওয়া দরকার নিরাপদ পানীয় জল, শৌচ-নিকাশি ব্যবস্থার দিকে, কারণ ঘন ঘন পেটের রোগ অপুষ্টির অন্যতম কারণ। নজর দাবি করে প্রান্তিক, বৈষম্য-পীড়িত জনগোষ্ঠীগুলি। দলিত, মুসলিম, বা জনজাতি-প্রধান গ্রাম; ভাটা, খনি বা খাদান-সংলগ্ন এলাকা; বন্ধ বাগান ও কারখানা-সংলগ্ন পরিবার; পরিযায়ী শ্রমিক, অনিশ্চিত জীবিকার উপর নির্ভরশীল পরিবারের শিশুদের যত্নের প্রয়োজন। টাকার অঙ্ক নয়, ‘যত্ন’-ই হয়ে উঠতে হবে সরকারি উদ্যোগের পরিমাপ।