আধুনিক প্রযুক্তিতে তেমন দড় নন, বরং পারতপক্ষে তাকে এড়িয়েই চলতে চান, এমন কাউকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, প্রতি দিন তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেন কি না, তিনি সম্ভবত বলবেন, না। অথচ, হাতে একটি স্মার্টফোন থাকলে নিজেদের অজানতেই আমাদের জীবনযাত্রায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ঘটে চলেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার ফিডই হোক অথবা ওটিটি-র ‘রেকমেন্ডেশন’; পথ খোঁজার ম্যাপই হোক অথবা অনলাইন ব্যাঙ্কের নিরাপত্তা বা ইমেলের স্প্যাম ফিল্টার, কোনও না কোনও রূপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের সাহায্য করে চলেছে। একে কি স্বাধীনতা বলা চলে না? পথ মনে রাখার বাধ্যবাধকতা থেকে স্বাধীনতা, অথবা খুঁটে খুঁটে প্রতিটি শব্দ টাইপ করা থেকে স্বাধীনতা? শুনতে সামান্য লাগলেও আসলে এর সবই উপভোক্তার উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। যেমন, এই প্রযুক্তির সাহায্যে অনেক সহজ হয়েছে বিরাট বড় কোনও নথির মূল কথাটি তুলে আনা, পরিসংখ্যানের সমুদ্র থেকে উদ্ধার করা কোনও নির্দিষ্ট প্রবণতা, অথবা নিজের ভাবনাকে গুছিয়ে নেওয়া। কর্মক্ষমতা বাড়ানোর পথে উপভোক্তার জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজ করে চলেছে। শুধু ব্যক্তির স্তরেই নয়, অর্থনীতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেও তার সুপ্রভাব এখন অনস্বীকার্য— কৃষিতে আবহাওয়ার পূর্বাভাস থেকে কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের হিসাবনিকাশ, চিকিৎসাশাস্ত্রের দুরূহ সমস্যার সমাধান থেকে সীমান্ত প্রতিরক্ষা, সব ক্ষেত্রেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষকে এনে দিয়েছে অনতিক্রম্য বাধাকে অতিক্রম করার স্বাধীনতা।
তবে, এই স্বাধীনতার ঠিক উল্টো পিঠেই রয়েছে পরাধীনতাও। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি মানুষকে বন্দি করতে পারে নজরদারির নিশ্ছিদ্র জালে। নজরদারি রাষ্ট্রীয় হতে পারে— যন্ত্রের মাধ্যমে মুখ চেনা থেকে শুরু করে ব্যক্তিবিশেষের প্রাত্যহিক কাজকর্ম বিশ্লেষণ করে তার ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ অনুমান ও সে অনুসারে দমনমূলক ব্যবস্থাগ্রহণ, ফোন বা ইন্টারনেটের উপরে নিরন্তর নজরদারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রাষ্ট্রের হাতে নাগরিককে নিয়ন্ত্রণ করার, নজরবন্দি করার এক অমিত শক্তিশালী অস্ত্র তুলে দিতে পারে। আবার, বেসরকারি সংস্থা, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির হাতেও ঠিক এই ক্ষমতাই আছে। রাষ্ট্রের যদি বা জবাবদিহির কিছুমাত্র দায় থাকে, বেসরকারি সংস্থা বা গোষ্ঠীর সেটুকুও নেই। এবং, এই নিয়ন্ত্রণ বা ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ যে সব সময় বোঝা যায়, তা-ও নয়। অনলাইন শপিংয়ের দুনিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে যে ভাবে মানুষের পছন্দকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, এক অর্থে তা-ও কি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নয়?
পারমাণবিক শক্তি আশীর্বাদ না অভিশাপ, স্কুলপড়ুয়াদের এই মর্মে প্রবন্ধ রচনা করতে হয়। তার পরীক্ষক-ধন্য উত্তর হল, সে শক্তি কী ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার উপরেই নির্ভর করে তা আশীর্বাদ হয়ে উঠবে, না কি অভিশাপ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও উত্তরটি সত্য— বস্তুত, আরও বেশি সত্য। কারণ, পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার তবুও রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত— অন্তত, কোনও বেসরকারি সংস্থার হাতে তার দায়িত্ব থাকলেও সে ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কথা। কিন্তু, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন এক অস্ত্র, যার অপব্যবহার যে কেউ করতে পারে। ফলে, স্বাধীনতার হাতিয়ার হয়ে ওঠার সামর্থ্য থাকলেও এই প্রযুক্তি যে চূড়ান্ত পরাধীনতার আয়ুধ হয়ে উঠবে না, সে ভরসা নেই।