নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ: শব্দবন্ধটি অক্ষরপ্রেমী বাঙালির কাছে অতিপরিচিত। দেড়শো বছরের কাছাকাছি হল এই রবীন্দ্রকবিতার বয়স, তবু আজও শব্দবন্ধটিকে কত ভাবে ব্যবহার করা যায় তা বাঙালি নতুন ভাবে শিখছে। ২০২৬ সালের দুর্গাপুজোর পশ্চিমবঙ্গ আবার কথাটিকে অশ্রুতপূর্ব ব্যঞ্জনায় ফিরিয়ে আনল। এ বারের পুজোর মরসুম জুড়ে চলল প্যান্ডেল-সংলগ্ন বইবিপণির উপর প্রবল হামলা, বিশেষত বাম-আদর্শে উদ্বুদ্ধ বিপণিগুলির উপর। বই ফেলে ছিঁড়ে ছড়িয়ে পায়ে-দলে বার্তা দেওয়া হল— পরিবর্তনের বাংলায় স্বাগত! যাদবপুরে সপ্তমীর রাতে বুলডোজ়ার এনে পুলিশবাহিনী বুকস্টল ভাঙার এক ভয়ানক দৃশ্যপট তৈরি করল, যা পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে চিরকালের জন্য খোদিত হয়ে থাকল। আলাদা করে বামপন্থী স্টলগুলিকেই ভাঙা হল, স্বাভাবিক ভাবেই: হিন্দুত্ববাদী বিশ্ববীক্ষা চিরকাল বামমনস্ক জ্ঞানচর্চাকেই সবচেয়ে বড় শত্রু বলে মনে করে এসেছে। নজিরবিহীন, অকল্পনীয়— ইত্যাদি শব্দে যেন এই নির্লজ্জতা ও বর্বরতার পরিমাণকে ধরা যায় না। বহু কাল ধরে বাঙালির যে শিক্ষাভিমানের গৌরব, তাকে যথেষ্ট পদদলিত করে ফেলা গেল এক পুজোতেই। মনে রাখা ভাল, এই ঘটনা কেবল কিছু সমাজবিরোধীদের দ্বারা সংঘটিত হয়নি। অন্তত যাদবপুরের ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, জননির্বাচিত সরকারের প্রতিনিধিদের পৌরোহিত্যেই এই দৃশ্য রচিত হয়েছে, ফলে সমগ্র বাঙালি সমাজকেই এই লজ্জা ও অনাচারের দায়টিকে বহন করতে হবে। এতৎসত্ত্বেও, কিংবা হয়তো এই আক্রমণের প্রতিশোধে, বামপন্থী বুকস্টলগুলিতে বইয়ের বিক্রিবাটা এ বার ভাল: সিপিএম-এর তরফে সে কথা ঘোষিত হতেই বিজেপি রাজ্য সভাপতি ব্যঙ্গতীক্ষ্ণ মন্তব্য করেছেন যে ওই সব দোকানে যা ছিল, তা তো ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’! অর্থাৎ অন্যত্র শমীকবাবুরা যতই ‘এর সঙ্গে বিজেপির যোগ নেই’ ইত্যাদি দাবি করুন না কেন, এই ধ্বংসোৎসবের মধ্যে তাঁরা আসলে বামেদের রাজনৈতিক নিয়তির প্রতিফলন দেখছেন।
বই-তাণ্ডবকে কেন্দ্র করে শমীক ভট্টাচার্য, স্বপন দাশগুপ্ত, নানা বঙ্গীয় বিজেপি নেতা-মন্ত্রীর নানা বয়ান উপেক্ষা করে সারসত্যটি এখন স্পষ্ট: ক্ষমতান্ধ হিন্দুত্ববাদের কাছে ‘অপ্রয়োজনীয়’ সব কিছু ভেঙে দিতে এখন বিজেপিশাসিত বাংলায় জারি হয়েছে বই-নাশকতার কার্যক্রম। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে পুজোর আগে থেকেই বারংবার আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে প্রশ্ন তুলতে দেখা গিয়েছে, পুজোর সময় বইয়ের স্টল হবে কেন? প্রশ্নটিকে সহজেই উল্টে দেওয়া যায়— অন্য হাজারো স্টল থাকলে বইয়ের স্টল থাকতে পারে না কেন? বাঙালি উৎসব বা মেলায় বইয়ের স্টল করার প্রচলন বহু দশকের, আজ তাতে নতুন আপত্তির কারণ কী।
প্রশ্নটির সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যাবে না জেনেই হয়তো আসরে নামানো হয়েছে অনুমতিপত্রের বিষয়টিকে। ইতিমধ্যে এই নিয়ে মামলাও হয়েছে। মামলার প্রেক্ষিতে হাই কোর্টের বক্তব্য, স্থানীয় পুজোকমিটির অনুমতি নেওয়াই কিন্তু স্টল করার পক্ষে যথেষ্ট নয়। বিচারবিভাগের বক্তব্যের প্রতি পূর্ণ সম্মান জানিয়েই কিছু সংশয় ব্যক্ত করা জরুরি। সঠিক অনুমতিপত্র বলতে কী বোঝানো হয়, তা কি আগে জানানো হয়েছিল? এত দিন ধরে যে ভাবে স্টল করা হয়েছে, তা থেকে কি কোনও পদ্ধতিগত পরিবর্তন ঘটেছে? ঘটলে কি তা আগে যথেষ্ট বিজ্ঞাপিত হয়েছে? সব স্টলের প্রতিই কি এক রকম নির্দেশ জারি হয়েছে? এই সব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। কেননা, যে বাঙালি সংস্কৃতিতে এক দিকে বইয়ে দেবী সরস্বতীর অধিষ্ঠান বলে মনে করা হয়, অন্য দিকে বই ও বইপ্রসূত জ্ঞানকে ক্ষমতার কেন্দ্র ও উৎস বলে মনে করা হয়— তার দিকে ধাবিত এই নারকীয় আক্রমণ, বাঙালি সমাজজীবনের বহুকালীন নির্ঝরটির স্বপ্নকে ভেঙে ফেলার এই উদ্ধত অপশক্তি— এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এখন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম কাজ।