ককরোচ জনতা পার্টির কলকাতা সফর বুঝিয়ে দিল, কলকাতা এখন মুখ বন্ধ রাখার শহর। একের পর এক সভা-কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিলেন সিজেপি-কে তাঁদের সভার জন্য হল দেওয়া যাবে না। একাধিক ক্ষেত্রে প্রাথমিক বুকিং বাতিল করা হল, কিছু ক্ষেত্রে সামান্য কারণ দেখিয়ে অনুরোধ অগ্রাহ্য হল। সব মিলিয়ে যা দাঁড়াল, একটি সভা না-হতে পারার ঘটনার অপেক্ষা তা অনেকখানি বড়— অর্থে এবং ব্যঞ্জনায়। কলকাতা স্বীকার করুক, সে এখন বাক্স্বাধীনতার সমাধি-রচনাকার। বিরোধী মত দেখলে সে ভয় পায়, তার প্রকাশের পথে যত রকম সম্ভব বাধাপ্রস্তর তৈরি করে দেওয়াই এখন কলকাতার নতুন স্বভাব। নতুবা কয়েক দিন আগে আর জি কর হাসপাতালে নির্যাতিতা ও নিহত চিকিৎসক-পড়ুয়ার মর্মান্তিক ঘটনাসূত্রে সেই ঐতিহাসিক ‘রাত দখল’ কার্যক্রমের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে এ বছরের ১৪ অগস্ট সারারাতব্যাপী আয়োজনে বাধা দিয়ে তা পণ্ড করে দেওয়া হত না। রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের নেতৃত্বে সমারোহ করে আর জি কর-প্রতিবাদ করলেও পাশাপাশি রাজ্য সরকার পূর্বতন ‘রাত দখল’ কর্মসূচির আহ্বায়ক নারী ট্রান্স কুইয়ার ঐক্যমঞ্চের সমাবেশের অধিকার বানচাল করত না। এত দিনে স্পষ্ট, প্রতিবাদ এই কলকাতার সয় না। একমাত্র সরকারই ‘প্রতিবাদ’ করতে পারে! সরকার কার প্রতিবাদ করবে, এ প্রশ্ন মনে উঠলেও মুখে না ওঠানোই ভাল। কেননা যে রাজনৈতিক পক্ষের প্রতিবাদ সয় না, স্বাভাবিক ভাবেই তাঁদের প্রশ্নও সয় না। ‘সহজে বোঝাতে হবে প্রতিবাদীমাত্রে শুধু ষড়যন্ত্রী, আর/ প্রতিরোধকারীমাত্রে আক্রমণকারী’: বাঙালি কবির লেখা পঙ্ক্তিগুলি আর এক বার উচ্চারণ করে নীরব হয়ে থাকাই এখন কল্লোলিনী তিলোত্তমার কর্তব্যকর্ম।
শাসক যে সমাজের মুখ বন্ধ রাখতে চায়, তা কোনও নতুন খবর নয়। গত আট দশক ধরে বারংবার এই দেশ, এই রাজ্য তা দেখে এসেছে, বিভিন্ন রং ও বিভিন্ন মতের সরকারের আমলে। তা সত্ত্বেও বলতে হবে, বর্তমান পরিস্থিতির কিছু বিশিষ্টতা আছে। প্রথমত, কোনও প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিতে নাম না লিখিয়েও একটি দলগোষ্ঠীকে তার বক্তব্য প্রকাশের জন্য আটকে দেওয়া হচ্ছে, এমন উদাহরণ এই ভূখণ্ডেও সুলভ নয়। এবং দ্বিতীয়ত, এমন ঘটনা ঘটলে সাধারণত কলকাতার রাজনীতি-সচেতন নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে প্রভূত ‘শব্দ’ শোনা যায়, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ দেখা যায়। কবি শঙ্খ ঘোষ ও অন্য কবি-লেখক-শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীরা অতীতে এমন ঘটনার সামনেই দাঁড়িয়ে উপরের পঙ্ক্তির মতো অনেক কথা লিখে ও বলে গিয়েছেন। কিন্তু এখন সেই বহুস্বর স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। নতুন সরকার কী ভাবে এই স্তব্ধীকরণ সম্ভব করেছে, তা নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা চলতে পারে, কিন্তু বাস্তব হল, তসলিমা নাসরিনকে বিজেপি-শাসিত পশ্চিমবঙ্গে ফিরিয়ে আনতে পারার গৌরবে যে কলকাতা উদ্দীপ্ত হয়, ভারতের অন্যান্য স্থান থেকে আসা কিংবা নিজের রাজ্যের প্রতিবাদীদের কথা বলার পরিসর সে আর দিতে পারে না। বাক্স্বাধীনতা তখনই জারি, যত ক্ষণ সেই বাক্-ধারা শাসকের গৌরবাভিমুখে ধাবিত। বিজেপি-শাসিত দিল্লি ও অন্যান্য রাজ্যে এমন স্বাধীনতাহীনতার দৃষ্টান্ত এত দিন ভূরি ভূরি দেখা গিয়েছে। কলকাতা ও গোটা পশ্চিমবঙ্গ এখন সেই অবরুদ্ধ ভারতের গর্বিত সদস্য।