E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

নির্দেশ

আপাত-যৌক্তিকতার অন্তরালে আছে এক অযৌক্তিক ও অনৈতিক কার্যক্রম। এর ফলে এক বিরাট সংখ্যক সাধারণ মানুষের শ্বাসরোধকারী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

শেষ আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৪২

অমৃতকালের ভারতে যে সব শব্দ বা শব্দবন্ধ ক্রমে বিরাট গুরুত্ব নিয়ে উদ্ভাসিত এবং ইতিহাসে চিরখোদিত হয়ে গেল, ‘ডিমনিটাইজ়েশন’ বা নোটবন্দি যদি তার একটি দৃষ্টান্ত হয়, ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ বা যৌক্তিক অসঙ্গতি সেই তালিকার সর্বশেষ ও ভয়ানকতম সংযোজন। ভোটারতালিকার বিশেষ সংশোধনের প্রেক্ষিতে শব্দবন্ধটি প্রথম দৃষ্টিতে যুক্তিগ্রাহ্য এবং নিরীহ। কিন্তু এই আপাত-যৌক্তিকতার অন্তরালে আছে এক অযৌক্তিক ও অনৈতিক কার্যক্রম। এর ফলে এক বিরাট সংখ্যক সাধারণ মানুষের শ্বাসরোধকারী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ দেশের মানুষের ঘরে ঘরে সরকারি নথি থাকে না, ফলে শুনানিতে আহূত হয়ে তাঁরা দিশাহারা বোধ করছেন, বেশ কিছু মানুষ আত্মঘাতী হয়েছেন। পরিস্থিতির চাপে কর্মকাণ্ড-সহায়ক বিএলও-রা অসুস্থ হয়েছেন, তাঁদের মধ্যেও আত্মহননের ঘটনা ঘটেছে। এ কোনও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দস্তুর হতে পারে না। পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী দলসমূহ, নাগরিক সমাজ ও প্রচারমাধ্যমের কিয়দংশ, এবং এই সম্পাদকীয় স্তম্ভও— বারংবার এই প্রক্রিয়ার সুষ্ঠু ও মানবিক পরিচালনা কত জরুরি, সে দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই কার্যক্রমের অনৈতিকতা ও অহেতুক অসংবেদনশীলতার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। নির্বাচন কমিশন কর্ণপাত করেনি, বরং ক্রমাগত নীতি পরিবর্তনের ফলে মানুষের যন্ত্রণা ক্রমশ বেড়েছে। সুপ্রিম কোর্ট এ বার নির্দেশ জারি করল— যে বিপুল সংখ্যক মানুষের নামে এই বিভ্রান্তি, তাঁদের নাম প্রকাশ্য তালিকা হিসাবে সর্বসমক্ষে আনতে হবে, নোটিসপ্রাপ্তরা নিজেদের মনোনীত ব্যক্তির মাধ্যমে শুনানি করাতে পারবেন, শুনানির সময়ে তাঁদের পছন্দসই বিএলএ-রা থাকতে পারবেন, জমা করা নথি সন্তোষজনক না-হলে পুনরায় শুনানির সুযোগ দিতে হবে, মাধ্যমিক পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড নথি হিসাবে গণ্য হবে ইত্যাদি। আদালতের নির্দেশগুলির অধিকাংশই নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক অবস্থানের বিপরীতমুখী। ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’-র বিষয়টি নিয়ে সর্বোচ্চ আদালত মৌলিক আপত্তি প্রকাশ না করলেও এই শব্দবন্ধের আড়ালে যে এক প্রকার স্বেচ্ছাচারিতা চলছে, তার পরোক্ষ ইঙ্গিত এই নির্দেশে খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

প্রশ্নের শুরু বিহার থেকে। তার পর গত দুই মাসে বিভিন্ন রাজ্য এসআইআর নিয়ে সঙ্কটগ্রস্ত। উত্তরপ্রদেশে খসড়াতালিকাতে বাদ-পড়া সংখ্যাটি বিস্ময়কর রকমের বেশি। তবে অধিকাংশ রাজ্যগুলিতে সহজবোধ্য কারণেই বিশেষ প্রতিরোধ দেখা যায়নি, যদিও সম্প্রতি শোনা গিয়েছে, রাজস্থানে এসআইআর-এর মাধ্যমে গোপনে মুসলমান ভোটারনাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে নাকি জনৈক বিএলও পদত্যাগপত্র দাখিল করেছেন। বিরোধীশাসিত পশ্চিমবঙ্গে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিরোধ ভিন্ন স্তরে উন্নীত, কেন তা বলা বাহুল্যমাত্র। তৃণমূল কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও দলীয় নেতারা ধারাবাহিক ভাবে বিষয়টি আদালতের সামনে উত্থাপিত করে যাচ্ছেন। সুতরাং, সুপ্রিম কোর্টের এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপে তৃণমূল কংগ্রেস নিজেদেরই জয় দেখছে।

প্রকৃতপক্ষে, সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে কোনও একটি দলের জয় দাবি করা— সঙ্কীর্ণ রাজনীতি। সমগ্র প্রক্রিয়াকে প্রকাশ্য করতে বলে বিচারবিভাগ যদি কাউকে জয়ী করে থাকে, তা হল ভারতের গণতন্ত্র। যে ভাবে কমিশনের কাজ চলছিল, বিজেপি নেতৃবর্গ নিজেরাই ঢাক পিটিয়ে বলছেন যে তাতে তাঁদের কতখানি স্বার্থসিদ্ধি। সংখ্যালঘু নাম বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা বার বার ব্যক্ত করেছেন শুভেন্দু অধিকারীরা, যাঁদের বক্তব্যের বিরুদ্ধে দল বা নির্বাচন কমিশন, কোনও পক্ষ থেকে প্রতিবাদ হয়নি। এক দিকে অযৌক্তিক ‘ডিসক্রিপ্যান্সি’র ভিত্তিতে নাম বাতিল, অন্য দিকে প্রশ্নযোগ্য ভোটারদের অন্তর্ভুক্তি, কোনওটিতে কমিশনের আপত্তি দেখা যায়নি। এখনও শুনানি পর্বের সপ্তাহ-দুয়েক বাকি— এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণত সাংবিধানিক ভাবে ঘটুক, এটাই নাগরিকের দাবি।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
SIR Voter Lists

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy