দুর্গাপুজোর সময় বাঙালি কী খাবে না খাবে তা নিয়ে এই সে দিন খাস বাংলার মাটিতে যে গোল বাধল, তার প্রেক্ষিতে ২০১৬-য় প্রকাশিত সমীক্ষার তথ্য তুলে ধরা যেতে পারে।রেজিস্ট্রার জেনারেল অব ইন্ডিয়া-র স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম বেসলাইন সার্ভে জানাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে ১৫ বছরের বেশি বয়সিদের মধ্যে ৯৮.৫৫% আমিষাশী: পুরুষদের ৯৮.৭%, মহিলাদের মধ্যে ৯৮.৪%। বাঙালি না হয় ‘পাখণ্ডী’, ভারতবাসী তবে কি? কারণ একই সমীক্ষামতে, ভারতে ১৫ বছরের বেশি বয়সিদের প্রায় ৭১% আমিষভোজী (পুরুষ ৭১.৬%, মহিলা ৭০.৭%)। জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষাও বলছে, ভারতের ১৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সি পুরুষদের ৮৩.৪% ও ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সি মহিলাদের ৭০.৬% আমিষ খান, এবং আগের আগের সমীক্ষাগুলির সঙ্গে তুলনায় এও স্পষ্ট— দেশে আমিষ খাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে বই কমেনি। আমেরিকান এক গবেষণা-সংস্থার সাম্প্রতিক সমীক্ষাও দেখিয়েছে, ভারতে জাতীয় স্তরে হিন্দুদের মধ্যে নিরামিষাশীর হার ৪৪%, পূর্ব ভারতে হিন্দুদের মধ্যে তা আরও অনেক কম, মাত্র ১৮%। বিদেশি গবেষণা ও সমীক্ষাকে যদি বা ভারতকে ছোট করার চক্রান্ত বলে দাগানো যায়, ঘরের সমীক্ষাকে করা যায় কি? উল্লিখিত প্রথম দু’টি সমীক্ষাই খোদ কেন্দ্রীয় সরকারের করা, তাদেরই তথ্য!
এই তথ্য শেষ বিচারে আমিষের শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি নয়, নিরামিষের পিছিয়ে পড়ারও নির্ণায়ক নয়। তথ্য বাস্তবতার পরিচায়ক; সমীক্ষার তথ্যও বাঙালি ও ভারতীয়দের খাদ্যাভ্যাসের প্রমাণমাত্র। তাই যারাই বাংলায় দুর্গাপুজোর সময় বা সাধারণ ভাবেও আমিষ-ভক্ষণকে হেয় ও নিরামিষ-ভোজনকে শ্রেয় ঘোষণার চেষ্টা করুক, বুঝতে হবে তাদের মতলব অন্য: একটি জাতির খাদ্যাভ্যাসকে ধর্ম ও নৈতিকতার সঙ্গে গুলিয়ে দিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে বিভেদ-বৈষম্যের বয়ান তৈরি করা। এই অভিসন্ধি রাজনৈতিক, বলা চলে ধর্মীয়-রাজনৈতিক— আরএসএস-বিজেপি এই অস্ত্রেই ভারতের বৃহদংশ ও সম্প্রতি বঙ্গও জয় করেছে। এই ধর্ম-রাজনীতির স্পষ্ট কিছু চিহ্নক আছে: এর ভাষা হিন্দি, শরীরভাষা উগ্র পৌরুষগন্ধী, খাদ্যাভ্যাস নিরামিষ। বহু ভাষা ধর্ম ও খাদ্যাভ্যাসের এই ভারতে কোন রাজ্যে কোন জাতিগোষ্ঠী আবহমান কাল ধরে কী খেয়ে আসছে তা এই রাজনীতির বিবেচনায় আসে না, ইতিহাস-সাহিত্যের ভূরি উদাহরণেও তা টলে না। এই অবস্থায় সরকারি তথ্যই তাদের সামনে তুলে ধরা দরকার। বলা দরকার, কেন্দ্রে যে দল সরকার চালাচ্ছে, বাংলাতেও যে দলের শাসন চলছে, এ তথ্য তাদেরই সমীক্ষাজাত, আকাশ থেকে পড়েনি।
বাংলায় এসে কে খাবার নিয়ে কোন নিদান দিলেন, তাতে বাঙালির চিরাচরিত খাদ্যাভ্যাসে ব্যত্যয় ঘটবে না, বলা বাহুল্য। বাগেশ্বর বাবা-কাণ্ডে বঙ্গ-বিজেপির নেতা-মন্ত্রীরা নিজেদের আমিষ-খাদ্যাভ্যাস বর্জন করার কথা বলেননি, দুর্গাপুজোয় পারিবারিক আমিষ ভোগের উদাহরণও বজায় থাকবে বলে জানিয়েছেন কেউ কেউ। অর্থাৎ এঁরা নিজেরাও জানেন, এবং মানেন— বাঙালির পাতে কী থাকবে সেই সিদ্ধান্ত কোনও রাজনৈতিক দল বা ধর্মীয় নির্দেশে নির্ধারিত হওয়ার নয়। ব্যক্তি বা জাতিগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাসে এ-হেন নিদান যে বাঙালি কদাপি আমল দেবে না সে অন্য কথা— প্রশ্ন হচ্ছে, এই হস্তক্ষেপই বা তারা সইবে কেন, কত দিনই বা?