E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

তোমার পূজার ছলে

প্রসঙ্গত, বারোয়ারি পূজার মধ্যে যে উচ্চাবচতাহীন সর্বজনীন গণতান্ত্রিক ধারণাটি ছিল— কতিপয় ধনীর গৃহকোণ থেকে হিন্দু বাঙালির বৃহত্তম উৎসবটিকে সবার নাগালের মধ্যে আনা— তার তুল্য সামাজিক ভাবনা সুলভ নয়।

শেষ আপডেট: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ ০৫:৪০

সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলার, পূজার আনন্দকে প্রকৃত অর্থেই সর্বজনীন করে তোলার পরিসরটি কী ভাবে শেষ পর্যন্ত এক মৃত্যুফাঁদে পরিণত হতে পারে, অর্থনীতির গল্পটি খোলসা না করলে সে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে না। শহর কলকাতায় বহু সর্বজনীন পূজা এখন কার্যত কর্পোরেট প্রকল্প, প্রতি বছর যার প্রতিটিকে কেন্দ্র করে বহু কোটি টাকার লেনদেন চলে। তার সিংহভাগ আসে বিজ্ঞাপন থেকে। এবং, যে পূজামণ্ডপ সর্বাধিক জনপ্রিয়, বিজ্ঞাপনদাতারা সেখানে বেশি টাকা ঢালতে আগ্রহী হন। পূজাকে আকর্ষণীয় করে তোলার একটি আয়ুধ অবশ্যই আরও শৈল্পিক ভাবনা, আরও সুচিন্তিত থিম, আরও নিখুঁত কাজ। কিন্তু, শুধু শিল্পে চিঁড়ে ভিজবে, সে নিশ্চয়তা নেই। সংবাদে প্রকাশ, বহু পূজা কমিটিই ইচ্ছাকৃত ভাবে মণ্ডপে প্রবেশের লাইনটিকে দীর্ঘতর করতে থাকে। অপ্রশস্ত লাইন, সঙ্কীর্ণ প্রবেশপথ, মণ্ডপের ভিতরে অপর্যাপ্ত পরিসর— সব মিলিয়ে মণ্ডপের বাইরে ভিড় জমতে থাকে। তার উপরে অধিকাংশ সর্বজনীন পূজাই চলে শাসক দলের বড়-মেজ-সেজ নেতাদের ‘অনুপ্রেরণা’য়, ফলে সব নিয়ম অবজ্ঞা করতেও বিশেষ সমস্যা হয় না। যত ভিড়, পূজা ততই সফল। মণ্ডপের বাইরে দীর্ঘ লাইন হয়তো অনুপ্রাণিত করে পুরস্কারদাতাদেরও। সব মিলিয়ে, এই ভিড়ই পরের বছরের ‘স্পনসরশিপ’ জোগাড় করার মূল পুঁজি। অতএব, নাগরিক সুরক্ষাকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ প্রদর্শন করে, সর্বজনীনতার ধর্ম বিসর্জন দিয়ে, কোনও আইন বা নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে তথাকথিত সর্বজনীন পূজাগুলিতে যা ঘটে, তা নিতান্তই ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যবর্তী এক ধূসর পরিসরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

প্রসঙ্গত, বারোয়ারি পূজার মধ্যে যে উচ্চাবচতাহীন সর্বজনীন গণতান্ত্রিক ধারণাটি ছিল— কতিপয় ধনীর গৃহকোণ থেকে হিন্দু বাঙালির বৃহত্তম উৎসবটিকে সবার নাগালের মধ্যে আনা— তার তুল্য সামাজিক ভাবনা সুলভ নয়। কিন্তু, একই সঙ্গে এ কথাও বলা জরুরি যে, ‘সর্বজনীন’ নামের আড়ালে বহু পূজা কমিটিই যা করে চলেছে, তার মধ্যে সেই সর্বজনীনতার তিলমাত্র নেই। থাকা সম্ভবও নয়, কারণ এত বিপুল অঙ্কের অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ সর্বজনীন হতে পারে না, তার রাশ কয়েক জনের হাতেই থাকে। বারোয়ারি পূজার এই চরিত্র পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটিকে যদি প্রশ্ন করতে হয়, তবে তা সামাজিক পরিসরেই করা বিধেয়। যাঁদের নামে পূজা, সেই ‘সর্বজন’ই কেন এমন প্রান্তিক হয়ে গেল— দুর্ভোগ ছাড়া আর কিছুতেই যাঁদের অধিকার নেই— পূজা কর্তাদের কাছে নাগরিকদের এই প্রশ্ন করার বিলক্ষণ কারণ আছে।

ভারতীয় সংবিধান কৌম বা ধর্মীয় কারণে মানুষের একত্রিত হওয়ার অধিকারকে মর্যাদা দেয়; এবং তার জন্য জনপরিসরের ব্যবহারও স্বীকৃত। কিন্তু, কৌমের নামে যদি অনুষ্ঠানটি মুষ্টিমেয় মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হয়ে দাঁড়ায়, তা হলেও কি জনপরিসরের উপরে সেই অবাধ অধিকার থাকতে পারে? কর্পোরেট পূজার ব্যবসার পুঁজি যদি হয় এই উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের আবেগ, তার ব্যবহৃত জমিটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নাগরিক সম্পত্তি। রাস্তা, বড় জোর শিশুদের খেলার মাঠ। ক’টা ক্লাবের নিজস্ব জমি আছে নিজস্ব পূজা আয়োজন করার মতো? পূজার তিন মাস আগে রাস্তা দখল হয়, বাড়ি ঢাকা পড়ে বিজ্ঞাপনে; ক্ষেত্রবিশেষে অ্যাম্বুল্যান্স যাতায়াতের পথটুকুও থাকে না। অর্থাৎ, সর্বজনীন পূজা জনপরিসরের দখল নিলে তার মূল্য চোকাতে হয় স্থানীয় মানুষকে। আক্ষরিক অর্থেই অর্থনৈতিক মূল্য। রাজনৈতিক প্রতিপত্তি বা বাহুবলে ক্লাবগুলি যে দখলদারির উপরে পূজার বাণিজ্যিকীকরণ করে, তার নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন করারও সময় এসেছে। সর্বজনীন পূজার আয়োজনে যাঁদের জীবনযাত্রা প্রত্যক্ষ ভাবে ব্যাহত হচ্ছে, এই পূজায় তাঁদের সম্মতি রয়েছে কি না, সে প্রশ্নও জরুরি। শারদোৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের আবেগের এই ব্যবহার কিন্তু বারোয়ারি পূজার সংস্কৃতি নয়।


এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Durga Puja medical treatment Advertisement Safety

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy