যাদবপুর-কাণ্ড আইনের শাসন ও তার অভাব ছাড়াও আর একটি জরুরি বিষয় সামনে নিয়ে এসেছে। সেটা ছাত্ররাজনীতির দরকার-অদরকার বিষয়ক। কলেজে-কলেজে ছাত্রভোটের মাধ্যমে ইউনিয়ন তৈরি নিয়ে সরকারি অবস্থান দর্শিয়ে বলা হয়েছে, যাদবপুরে কোনও অনাচার চলবে না। অবশ্যই, এর সঙ্গে কলেজে রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের কোনও সম্পর্ক নেই— সে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হবে, কেননা জানা গিয়েছে কলেজের পরিচালন সমিতির মাথায় বিজেপির নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বসানোর সিদ্ধান্তের কথা। বিজেপির রাজ্যসভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন যে শিক্ষাক্ষেত্রে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণের জন্যই এই পদক্ষেপ জরুরি। রাজনীতির লোক বসিয়ে রাজনীতি বন্ধ করা? ব্যবস্থাটি নতুন নয়— এমনই চলে এসেছে অনেক কাল ধরে। তার বিরুদ্ধে প্রশ্নও উঠেছে ধারাবাহিক ভাবে। আজ এই প্রশ্ন উঠলে হয়তো শমীকবাবুরা বলবেন, গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো হতে পারে, কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা যেতে পারে, আর রাজনীতি দিয়ে রাজনীতি বিদেয় করাই খারাপ কথা? তবে কিনা, প্রশ্ন তুলবেই বা কে। পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী পরিসরে এখন সুকুমার রায়ের ‘খিচুড়ি’ ছড়ার অতি খাসা বকচ্ছপ মূর্তি: ‘বাহবা কি ফুর্তি’।
ইত্যবসরে ছাত্ররাজনীতি বিষয়ক কতকগুলি গোড়ার কথা খোলসা করে নেওয়া যায়। পশ্চিমবঙ্গে গত আট দশক ধরে ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে যত নৈরাজ্য ও অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তার সুস্থ বিশ্লেষণ বলে যে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি বলে এখানে যা চলে এসেছে, তাকে ঠিক ছাত্র-রাজনীতি বলা চলে না, বরং সেটা বাইরের বৃহত্তর রাজনীতির ছাত্রপোষ্য সংস্করণ। রাজ্যের শাসক ও বিরোধীর সংঘর্ষ— কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের মধ্যে। বিজেপি নেতারা আজ ঠিক যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, গত কয়েক দশক ধরে তেমনই চলে এসেছে। কলেজের ক্ষমতার রাশটি থেকেছে প্রধানত শাসক দলের হাতে— যাদবপুর খানিক ব্যতিক্রম ছিল বলেই এত দিন ধরে তা রণক্ষেত্রসম। কলেজে-কলেজে টাকা ওড়ানোর চল হয়েছে। নবীনবরণ বা ফেস্ট এখন কলেজের নিজস্ব উৎসব নয়, প্রভূত পরিমাণ টাকা সেখানে আসে কলেজের বাইরের রাজনৈতিক দাদামহল থেকে। টাকার মাধ্যমে সর্বস্তরে অধিকার কায়েম করা হয়। ফলে ছাত্ররাজনীতির নামে আসলে রাজ্যের দলীয় রাজনীতির অন্যতম মঞ্চ হয়েছে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়। আজকের পশ্চিমবঙ্গে নতুন শাসক দল এখন তারই পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে উদ্যত। পুরনো কথা তুলে বলতে হয়— ‘ওরে ভাই, কার নিন্দা কর তুমি’?
এই ভয়ানক পরিস্থিতির বলি হল শিক্ষাব্যবস্থা, এবং সেই সূত্রে ছাত্রছাত্রীর বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। সংঘর্ষ যত তীব্র হয়, নিরাপত্তার অভাবও তত বাড়ে। এই ভীষণতা থেকে নিষ্কৃতির উপায় একটিই: ছাত্ররাজনীতি থেকে রাজনৈতিক রংকে সম্পূর্ণ ভাবে বর্জন করা। কেবল খাতায়-কলমে রাজনৈতিক দল থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করাই যথেষ্ট নয়, সেই রাজনীতিকে নিবদ্ধ থাকতে হবে কলেজের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে, এবং বাইরের রাজনীতির সঙ্গে একলীন না হয়ে। এটিই একমাত্র পথ, তবে অকল্পনীয় রকমের দুঃসাধ্য সেই যাত্রা। পশ্চিমবঙ্গকে যদি সেই যাত্রা করতে হয়, তা হলে ছাত্রসমাজকেই সর্ব দলের সর্ব বর্ণের সামগ্রিক রাজনৈতিক মহলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। কোনও না কোনও দিন।