আজ থেকে পাঠশালা বন্ধ— বিখ্যাত চলচ্চিত্রের কালজয়ী সংলাপ, আবার পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ও সরকারপোষিত বিদ্যালয়গুলির ক্ষেত্রে বিগত কয়েক বছরে তা ঘোর বাস্তবও। বিদ্যালয় বন্ধের কারণ বহুবিধ। নির্বাচন, প্রখর গ্রীষ্ম, শিক্ষক-সঙ্কট ইত্যাদি। সদ্য নির্বাচন, গরমের ছুটি কাটিয়ে বিদ্যালয়গুলিতে নিয়মিত পঠনপাঠনের ছন্দ ফিরেছিল। কিন্তু তারই মধ্যে বেশ কিছু ক্ষেত্রে তাল কাটার খবর মিলেছে। যেমন— সল্ট লেকের এক সুপরিচিত বিদ্যালয়ে রীতিমতো বিজ্ঞপ্তি জারি করে শিক্ষার্থীদের প্রতি দিন স্কুলে আসতে বারণ করা হয়েছে। রুটিন করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, প্রাথমিক বিভাগে কবে, কোন শ্রেণির, কোন সেকশন-এর ক্লাস বন্ধ থাকবে, কোন দিন সবাইকে স্কুলে আসতে হবে। এ-ও জানানো হয়েছে, পরবর্তী বিজ্ঞপ্তি না দেওয়া অবধি এমন ব্যবস্থাই চলবে। কারণ, প্রতি দিন সব সেকশনে ক্লাস করানোর মতো উপযুক্ত সংখ্যক শিক্ষক স্কুলে নেই। অনুমোদিত ১৫টি শিক্ষক-পদের মধ্যে স্থায়ী শিক্ষক রয়েছেন মাত্র চার জন। পার্শ্ববর্তী স্কুলের সাত জন শিক্ষককে ডেপুটেশনে আনা হলেও অনেকে ছুটিতে যাওয়ায় সমস্যা বেড়েছে।
এই ভয়ঙ্কর অসাম্য রাজ্যের সর্বত্র। হাতেগোনা শিক্ষককে একই সঙ্গে একাধিক ক্লাসে পড়াতে হচ্ছে, শিক্ষকের অভাবে উঁচু ক্লাসে বিজ্ঞানে ভর্তি বন্ধ থাকছে— এ-ও যেমন সত্যি, তেমনই শিক্ষার্থীর সংখ্যা তলানিতে ঠেকায় শিক্ষকদের দিনের পর দিন কার্যত বসে থাকতে হচ্ছে— এ-ও সমান সত্যি। পূর্বতন তৃণমূল সরকার এই বাস্তবটিকে অগ্রাহ্য করে সরকারি শিক্ষাকে মহাপ্রস্থানের পথে ঠেলে দিয়েছিল। তদুপরি যোগ হয়েছিল স্কুল বন্ধ রাখার হরেক অজুহাত। বর্তমান বিজেপি সরকার গোড়া থেকেই শিক্ষাব্যবস্থার হাল ফেরানোর কথা বহুমুখে প্রচার করেছে। কিন্তু, শুধুমাত্র গ্রীষ্মের ছুটিকে দীর্ঘতর হতে না দেওয়া এবং মিড-ডে মিলে কিছু বরাদ্দ বৃদ্ধি করলেই শিক্ষাব্যবস্থার যথেষ্ট সংস্কার হয় না। এত দিনে পচন সরকারি বিদ্যালয় শিক্ষার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। অবিলম্বে সুপরিকল্পিত এবং সুনির্দিষ্ট পথে তার মোকাবিলা করা প্রয়োজন। তেমন উদ্যোগ কিন্তু এখনও চোখে পড়ছে না। বরং, জনগণনার কাজে বিভিন্ন সরকারি স্কুলের অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকাকে নিযুক্ত করা হয়েছে। ফলে, ফের শ্রেণিকক্ষের পঠনপাঠন বাধাপ্রাপ্ত হবে। তা ছাড়া জনগণনার প্রশিক্ষণের জন্য কলকাতার বেশ কিছু স্কুলও নির্দিষ্ট করা হয়েছে। তাদের অনেকগুলিতেই প্রশিক্ষণ ও পঠনপাঠন এক সঙ্গে চালানোর পরিকাঠামো নেই। ফলত, সেই সব স্কুল নির্দিষ্ট দিনগুলিতে হয় সম্পূর্ণ ছুটি থাকবে, নয়তো কিছু ক্লাস বন্ধ রেখে অন্যগুলিতে পঠনপাঠন চলবে।
মনে রাখা প্রয়োজন, বিদ্যালয়ের পঠনপাঠনে সাময়িক বিরতিও শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করতে পারে। কারণ, এই স্কুলগুলিতে যারা পড়ে, তাদের এক বিরাট অংশ দরিদ্র পরিবার থেকে আসে। অনেকেই প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া। অতএব স্কুল বন্ধের অর্থ তাদের পড়াশোনাতেও ইতি। তদুপরি, স্কুল বন্ধ থাকলে মিড-ডে মিলও তারা পায় না। অপুষ্ট শিশুর জন্য এই ক্ষতি অপূরণীয়। বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় প্রবেশের সুযোগ তাদের নেই। তবে কি তারা পুষ্টিবঞ্চিত হয়ে, শিক্ষার জন্য প্রতিনিয়ত সরকারের দয়াপ্রত্যাশী হয়েই শিক্ষাজীবন সম্পূর্ণ করবে?