E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

নিয়মহীন

পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট, এই বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মার্চ পর্যন্ত শুধুমাত্র কলকাতার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে লিফ্ট বসানো ও তার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৫২টি দরপত্র ডাকা হয়েছিল। এর মধ্যে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ভাগে জুটেছে মাত্র তিনটি কাজ।

শেষ আপডেট: ০১ এপ্রিল ২০২৬ ০৬:০৯

আর জি কর হাসপাতালে লিফ্ট দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি আইনজীবী আদালতে জানিয়েছিলেন, সাধারণ মানুষের ব্যবহারের লিফ্টগুলিকে মারণযন্ত্রে পরিণত করা হয়েছে। প্রশ্ন হল, সরকারি হাসপাতালের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে যাতে লিফ্টগুলি মারণযন্ত্রে পরিণত না-হয়, তার জন্য উপযুক্ত নজরদারি ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা আর জি করে আদৌ ছিল কি? ২০২৪ সালে এই হাসপাতালেই চিকিৎসক-পড়ুয়ার মর্মান্তিক মৃত্যুর পর রাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রবল দুর্নীতি, স্বজনপোষণ এবং পরিকাঠামোগত অব্যবস্থার চিত্র সামনে এসেছিল। আর জি কর আন্দোলনের মূল লক্ষ্যই ছিল সেই অব্যবস্থা, দুর্নীতির স্থায়ী প্রতিকার। সেই প্রতিকার বিষয়ে স্বাস্থ্য দফতর যথেষ্ট উদ্যোগী হলে হয়তো এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এড়ানো যেত। কিন্তু তেমনটি ঘটেনি। বরং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দীর্ঘ অবহেলাই পরিস্থিতিকে এতখানি বিপজ্জনক করে তুলেছে।

পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট, এই বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মার্চ পর্যন্ত শুধুমাত্র কলকাতার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে লিফ্ট বসানো ও তার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৫২টি দরপত্র ডাকা হয়েছিল। এর মধ্যে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ভাগে জুটেছে মাত্র তিনটি কাজ। এবং অন্য প্রথম সারির হাসপাতালে যেখানে লিফ্ট পরিচালনার জন্য কর্মী নিয়োগ, সম্পূর্ণ নতুন প্রযুক্তির স্বয়ংক্রিয় লিফ্ট বসানো এবং যান্ত্রিক ত্রুটি এড়ানোর জন্য বছরভর নিবিড় রক্ষণাবেক্ষণের চুক্তি করা হয়েছে, সেখানে আর জি করের জন্য বরাদ্দ কাজগুলি— লিফ্টে ভাঙা টাইলসের বদলে ম্যাট বসানো, লিফ্টের গর্ত পরিষ্কার, গেটের যন্ত্রাংশ পাল্টানো ইত্যাদি। কেন অন্য হাসপাতালের সঙ্গে কাজের এমন পার্থক্য, কোন দুঃসাহসে ভর করে লিফ্ট চালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের মতো অগ্রাধিকার-ভিত্তিক কাজগুলি এড়িয়ে যাওয়া গেল— সে প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত দুর্ঘটনাগ্রস্ত লিফ্টের অন্দরেই চিরকাল চাপা পড়ে থাকবে। সরকারি হাসপাতাল, যেখানে প্রতি দিন অসংখ্য রোগী সুলভ চিকিৎসার সন্ধানে আসেন, সেখানে লিফ্ট, শৌচালয় প্রভৃতি অতি জরুরি বিষয় নিয়ে কেন এত অভিযোগ শোনা যায়, তারও কি কোনও উত্তর আছে? শুধুমাত্র দৃষ্টিনন্দন প্রবেশদ্বার তৈরি করলে বা ‘সুপার স্পেশ্যালিটি’ তকমা জুড়ে দিলেই যে সরকারি হাসপাতালে রোগী হয়রানির পরিচিত চিত্রটি রাতারাতি পাল্টে যায় না, সে কথা আর কত প্রাণের বিনিময়ে সরকারের মগজস্থ হবে?

এই চরম অবহেলার চিত্রই দেখা যায় চম্পাহাটি, বেগমপুর, দক্ষিণ গড়িয়া পঞ্চায়েতের বেআইনি বাজি নির্মাণ, বিক্রিতে, নিয়মিত ব্যবধানে হোটেল, বহুতল, বাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায়, জলাভূমি বুজিয়ে বেআইনি নির্মাণে। যখন পরিস্থিতি জটিলতর হয়, মৃত্যুমিছিল দেখে নাগরিক রোষ উপচে পড়ে, তখন আশ্বাসবাণী বর্ষিত হয়, অকৃপণ। কিন্তু তার পর ফের শূন্যে ফিরে যাওয়া, অব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি। এই আলোতেই আর জি কর কাণ্ডকেও দেখা প্রয়োজন। মৃত্যুর শোক যখন মিলিয়ে যাবে, তখন যে সরকারি হাসপাতালে রোগী-নিরাপত্তার বেহাল দশাটি আবার ফিরবে না, সেই গ্যারান্টি কে দেবে? না কি ফের অপেক্ষার পর্ব চলবে, কখন আর একটি বিকল লিফ্ট, বন্ধ শৌচালয়, অকেজো অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা অসহায় নাগরিক-মৃত্যুর কারণ হিসাবে উঠে আসবে?

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
RG Kar Case Government hospitals

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy