আশঙ্কা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ বাংলাকে অনেকটাই স্বস্তি দিয়েছে। কয়েক দিন রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি, কাঁথি-সহ সমুদ্রোপকূলবর্তী কয়েক জায়গায় ঝোড়ো হাওয়া, উত্তাল সমুদ্রের কারণে বেশ কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ঠিকই; কিন্তু সে সবই ক্যাটেগরি-৩ ছুঁয়ে ফেলা অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের পরোক্ষ প্রভাব। সরাসরি এই বঙ্গের দিকে সে ধেয়ে এলে, বা কাছাকাছি ‘ল্যান্ডফল’ হলে যে মাপের ক্ষয়ক্ষতির সাক্ষী হতে হত, তার হাত থেকে আপাতত নিস্তার মিলেছে। আপাতত, কারণ বর্ষাশেষের এই সময়টি বঙ্গোপসাগরে ‘ঘূর্ণিঝড়ের মরসুম’। সাগরে ঘন ঘন তৈরি হওয়া নিম্নচাপ অঞ্চল থেকে ফের ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সে ক্ষেত্রে তার অভিমুখ পশ্চিমবঙ্গ বা নিকটবর্তী উপকূল হলে বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী, ঠিক যেমনটি এ বার প্রত্যক্ষ করেছে অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশার এক বড় অংশ। পূর্বাভাস মতোই বুধবার ভোররাতে অন্ধ্রপ্রদেশের নরসাপুর থেকে ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে আছড়ে পড়ে ‘অর্ণব’, সর্বোচ্চ গতি পৌঁছেছিল ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার। গাছ ভেঙে, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে অন্ধ্রপ্রদেশে প্রাণহানি হয়েছে অন্তত পাঁচ জনের। প্রবল বৃষ্টি, ঝড়ে বিপর্যস্ত হয়েছে সংলগ্ন ওড়িশার এক বিশাল অংশও।
ঝড়ের ক্ষতি শুধুমাত্র প্রাণহানির হিসাবে মাপা চলে না। সাম্প্রতিক কালে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সাগরে সাইক্লোনের জন্ম থেকে সম্ভাব্য গতিপথ, এবং হাওয়ার তীব্রতার পূর্বাভাস যথেষ্ট আগে থেকে দেওয়া সম্ভবপর হয়েছে। কিন্তু অন্য ক্ষতিগুলি কমানো যায়নি। জীবিকা, বাসস্থান, ফসলের যে অপূরণীয় ক্ষতির সামনে পড়েন অসংখ্য মানুষ, তা থেকে নিস্তার মেলেনি। নিস্তার মেলেনি ঝড়ের কারণে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ক্ষতি থেকেও। এই মাপের একটি ঝড় যে ভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্তব্ধ করে দেয়, বিদ্যুৎ সরবরাহ তছনছ করে, কর্মময়তাকে থমকে দেয়, তার ধাক্কা কাটিয়ে ওঠা সহজ নয়। শক্তিশালী সাইক্লোন তাই ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের কাছে গভীর উদ্বেগের। ২০০৯ সালের মে মাসে সুন্দরবন অঞ্চলে আছড়ে পড়া ‘আয়লা’ পাকাপাকি ভাবে পাল্টে দিয়েছিল বাদাবনের জনজীবনকে। এগারো বছর পর সেই মে মাসেই পশ্চিমবঙ্গের উপকূলে আঘাত হানে সুপার সাইক্লোন ‘আমপান’। সুন্দরবনে পরিযাণ তীব্রতর হয়।
সমস্যা হল, বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে আগামী দিনে ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পাবে। বিশেষজ্ঞদের এই ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতা সাম্প্রতিক বছরগুলিতেই টের পাওয়া গিয়েছে। দু’টি অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের আগমনের মধ্যবর্তী সময়সীমাটি সংক্ষিপ্ত হয়েছে ইতিমধ্যেই। এই বছরের শক্তিশালী এল নিনিয়ো পরিস্থিতি যে ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়কে দ্রুত ঘনীভূত করে তার শক্তিবৃদ্ধি করছে— বিজ্ঞানীমহলে সে কথাও আলোচিত। অতএব ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে প্রশাসনকে। শুধুমাত্র সাময়িক ভাবে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া নয়, স্থায়ী পুনর্বাসন নীতি গঠন করতে হবে। বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। এবং উপকূলীয় ক্ষত ও ঝড় সামলানোর উপযোগী পরিকাঠামোয় বিনিয়োগ করতে হবে। সময় আর নেই, আগামী দিনে সরকারি সিদ্ধান্তের উপরেই নির্ভর করবে উপকূলের বাসিন্দাদের জীবন-জীবিকা।