E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সলিলসমাধি

স্বাভাবিক ভাবেই উষ্ণায়নের গতি স্তিমিত না হলে আগামী দিনে এই শহর দু’টির লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরবাড়ি, জীবন, জীবিকা হারিয়ে বিপন্ন হয়ে পড়বেন। ঠিক সেই কথাটিই রাষ্ট্রপুঞ্জ তার রিপোর্টে আরও এক বার মনে করিয়ে দিয়েছে।

শেষ আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৭:০২

রাষ্ট্রপুঞ্জের ‘সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ ও মোকাবিলার পথ’ সংক্রান্ত যে রিপোর্ট নিয়ে এখন কিঞ্চিৎ শোরগোল পড়েছে, তা কি নেহাতই অপ্রত্যাশিত ছিল? বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রক্রিয়াটি যত অপ্রতিরোধ্য গতিতে বেড়ে চলবে, তত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে তীরবর্তী অঞ্চলগুলি বিপন্ন হয়ে পড়বে, এ কথা আগেও আন্তর্জাতিক নানা রিপোর্টে উঠে এসেছে। কলকাতা, মুম্বই উভয় শহরই সমুদ্রোপকূলবর্তী। স্বাভাবিক ভাবেই উষ্ণায়নের গতি স্তিমিত না হলে আগামী দিনে এই শহর দু’টির লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরবাড়ি, জীবন, জীবিকা হারিয়ে বিপন্ন হয়ে পড়বেন। ঠিক সেই কথাটিই রাষ্ট্রপুঞ্জ তার রিপোর্টে আরও এক বার মনে করিয়ে দিয়েছে। এবং জানিয়েছে, সমুদ্রের জলের উচ্চতা বৃদ্ধির বিষয়টি এখন আর কোনও সুদূরের সতর্কবার্তা নয়, এখন সেটাই ঘটে চলেছে এবং আগের চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে। এই রিপোর্ট সাম্প্রতিক কালে যে ভাবে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে, তার অন্যতম কারণ— এত কাল মানুষ যাকে অন্য দেশের বিপদ বলে মনে করত, এখন তা তার দোরগোড়ায় উপস্থিত। ঘরের কাছেই, কখনও ঘরের পাশেই একের পর এক বিপর্যয় তা বুঝিয়ে দিয়েছে।

এত দিনে স্পষ্ট, বিশ্বের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে বেঁধে রাখার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাগুলি প্রায় ব্যর্থ। এখনও সম-গুরুত্ব সহকারে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের রূপরেখা প্রস্তুত করেনি বিশ্বের বহু দেশ এবং দরিদ্র দেশগুলিতে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি পরিকাঠামো গড়ে তোলায় উন্নত দেশগুলি যথেষ্ট সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়নি। ফলে, বিপদরেখা ছুঁয়ে ফেলা গিয়েছে সহজেই। আগামী দিনে তারই করুণ পরিণতি ভুগতে হবে প্রশান্ত মহাসাগর, ভারত মহাসাগরের উপকূলের অসংখ্য বাসিন্দাকে। বাদ পড়বে না অতলান্তিক-তীরবর্তী বিস্তীর্ণ অংশও। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির অর্থ শুধুমাত্র কিছু দ্বীপের তলিয়ে যাওয়াই নয়, বিপদ বহুস্তরীয়। মিঠে জলের উৎসে মিশবে সাগরের নোনা জল, ছড়িয়ে পড়বে চাষজমিতেও, হারিয়ে যাবে প্রবাল প্রাচীর, তীব্রতর হবে বন্যার আঘাত, বাড়বে উপকূলীয় ক্ষয়। ইতিমধ্যেই সুন্দরবনে তার প্রভাবটি স্পষ্ট। সমুদ্রের গ্রাসে হারিয়েছে ঘোড়ামারা দ্বীপ, জম্বুদ্বীপের বড় অংশ। বিনষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক ঢাল ম্যানগ্রোভ। ম্যানগ্রোভের প্রাচীর না থাকলে শক্তিশালী সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় ভবিষ্যতে সরাসরি আঘাত হানবে কলকাতায়।

আগামী দিনের এই ঘরবাড়ি-জীবিকাহারা বিপুল পরিমাণ মানুষের জন্য এখনও কোনও আইনের উপস্থিতি নেই ভারতে। আবহাওয়াজনিত কারণে যাঁরা ঘর-বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন, তাঁদের অভ্যন্তরীণ ভাবে বাস্তুচ্যুত হিসাবে দেখাই দস্তুর। এবং, আগামী দিনে তাঁদের পুনর্বাসন বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনও ভাবনা নীতি নির্ধারকদের আলোচনায় নেই। উদ্বেগের বীজটি লুকিয়ে আছে এখানেই। সুন্দরবন জানে, জলের গ্রাসে, ঝড়ের দাপটে তলিয়ে যাওয়া বাস্তুভিটে, চাষের জমির অর্থ কী। জানে, তার ধাক্কায় কী ভাবে রাতারাতি বদলে যেতে পারে একটি গোটা অঞ্চলের জনবিন্যাস, আর্থ-সামাজিক কাঠামো। বন্ধ হয় শিশুর ভবিষ্যৎ গঠনের স্বপ্ন। বিপন্নতর হয় মেয়েদের সামাজিক নিরাপত্তা। ভারতের দুর্ভাগ্য, কলকাতা-সহ তার বিস্তীর্ণ উপকূলভাগের বহু অঞ্চল এখন সেই অনিশ্চয়তারই প্রহর গুনছে।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Global Warming Climate Change United Nations report United Nation

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy