বাজারে চিনির দাম প্রবল গতিতে ঊর্ধ্বমুখী। দু’মাস আগেও খুচরো বাজারে মোটামুটি চল্লিশ টাকা কিলোগ্রাম দরে বিক্রি হত চিনি; বাড়তে বাড়তে তা পঁয়ষট্টি টাকার সীমা অতিক্রম করেছে। তবে সরকার জানিয়েছে যে, বিবিধ ব্যবস্থা গ্রহণের পরে এক্স মিল বা উৎপাদকদের নেওয়া দাম হ্রাস পেয়েছে ২০ শতাংশ। আশা করা যায়, পাইকারি এবং খুচরো বাজারেও তা প্রতিফলন ঘটবে। চিনির দাম হঠাৎ এমন বাড়ল কেন, তার একাধিক কারণ। প্রথমত, ফসলের রোগ, এবং অসময়ে বৃষ্টি, দুই কারণে স্বাভাবিকের তুলনায় আখের প্রকৃত উৎপাদন দশ শতাংশ কম হয়েছে। কিন্তু, উৎপাদন যে কম হবে, সেটা হাতে যথেষ্ট সময় থাকতেই টের পাওয়া গিয়েছিল। তার পরও কেন্দ্রীয় সরকার চিনি রফতানিতে উৎসাহ দিয়েছিল। কেন, সে উত্তর অস্পষ্ট। তার পর পাইকারি বাজারে চিনির দাম হুহু করে বাড়তে থাকায় রফতানি নিষিদ্ধ হল, এবং আমদানির উপরে শুল্ক মকুব করে দেওয়া হল। একই পণ্যের ক্ষেত্রে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে এমন সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দু’টি নীতি গ্রহণে স্পষ্ট যে, কৃষি-অর্থনীতি কোন পথে যাচ্ছে, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের হয় ধারণা নেই, অথবা কোনও বিশেষ গোষ্ঠীর কোনও গভীরতর স্বার্থের গুরুত্ব ভারতীয় অর্থব্যবস্থার স্বার্থের তুলনায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কোন কারণটি কম বিপজ্জনক, বলা মুশকিল।
আখের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে ঘাটতি অবশ্য চিনির মূল্যবৃদ্ধির একমাত্র কারণ নয়। বৈশ্বিক স্তরে আখের বৃহত্তম উৎপাদক ব্রাজ়িলেও উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। ফলে, আন্তর্জাতিক বাজারেও চিনির দাম ঊর্ধ্বগামী। এই পরিস্থিতিতে ভারতের অভ্যন্তরীণ ঘাটতি বিশেষ উদ্বেগ তৈরি করেছে। তার ফলে চিনি মজুত করার প্রবণতাও বেড়েছে। নরম পানীয় প্রস্তুতকারক সংস্থা বা মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীরা চিনির বড় মাপের ক্রেতা। সাধারণ অবস্থায় যখন যেমন প্রয়োজন হয়, এই ব্যবসায়ীরা তখন তেমন ভাবে চিনি কিনতে থাকেন। কিন্তু, বাজারে জোগানের ঘাটতি দেখা দিতে পারে, এই আশঙ্কায় সংস্থাগুলি বেশ কয়েক মাসের চিনি একলপ্তে কিনতে আগ্রহী হয়েছে। ফলে, বাজারের মূল্যস্তরে তারও প্রভাব পড়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার নিয়ম বেঁধে দিয়েছে যে, এই পাইকারি ক্রেতারা এক সঙ্গে ১৫ দিনের চেয়ে বেশি চিনি কিনতে পারবেন না। তাতে চাহিদায় খানিক হলেও রাশ টানা যাবে। মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে বছরের সবচেয়ে বেশি চাহিদার মরসুম আসছে— পূজা-দীপাবলি থেকে বড়দিন অবধি। ফলে, চিনির জোগান এবং সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে তাদের উদ্বেগও স্বাভাবিক। ৩১ অক্টোবর অবধি বিনা শুল্কে মোট দশ লক্ষ টন চিনি আমদানির ছাড়পত্র দিয়েছে সরকার— গত এক দশকে এই প্রথম এত বড় মাপে চিনি আমদানি করছে ভারত।
কেন্দ্রীয় সরকার অতি দ্রুত জানিয়েছে, চিনির বাজারে জোগানের পিছনে ইথানল উৎপাদনের দায় নেই। আপাতদৃষ্টিতে কথাটি সত্য। ২০২২-২৩’এ দেশের মোট আখ উৎপাদনের ১২ শতাংশ যেত ইথানল উৎপাদনে; এখন এই অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে ন’শতাংশে। বর্তমানে ইথানল উৎপাদনের প্রধান উপাদান খাদ্যশস্য, মূলত ভুট্টা। সমস্যা হল, বাজার কেবলমাত্র বর্তমান পরিস্থিতির ভিত্তিতেই চলে না— তা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পরিস্থিতির হিসাবও কষে। কেউ বলতেই পারেন, কেন্দ্রীয় সরকার যে ভঙ্গিতে ইথানলের উপরে জোর দিচ্ছে, তাতে বাজারে অনুমানের যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, ভবিষ্যতে ইথানলের উৎপাদন আরও বাড়বে। সেই বর্ধিত উৎপাদনকে সামাল দেওয়ার মতো ভুট্টা ভারতে উৎপন্ন হয় না। তার উৎপাদনশীলতা অতি দ্রুত বৃদ্ধি পাবে, সে সম্ভাবনাও ক্ষীণ। ফলে, ইথানল উৎপাদনে জোর বাড়লে সে ক্ষেত্রে আরও বেশি আখ চলে যাবে, অতএব চিনি উৎপাদনের জন্য আখের জোগানে ঘাটতি দেখা দেবে, বাজারে এমন আশঙ্কা থাকা অস্বাভাবিক নয়। কাজেই, শুধু তাৎক্ষণিক ব্যবস্থাই নয়, বাজারের সংশয় দূর করতেও সরকারের উদ্যোগ প্রয়োজন।