দেড় বছর ধরে তিলে তিলে সঙ্গীকে গড়ে তুলেছিল মেয়েটি। সরকারের নির্দেশে এক দিন উধাও হয়ে গেল সেই সঙ্গী। মেয়েটি সাংবাদিকদের জানিয়েছে, সে কিছুতেই ভুলতে পারছে না সেই সঙ্গীকে— তার চোখের জল বাঁধ মানছে না। ঘটনাটি চিনের। সে দেশের সরকার এক বিশেষ গোত্রের চ্যাটবটের ক্ষেত্রে— যে চ্যাটবট কোনও অনুভূতি, কামনা-বাসনাসম্পন্ন মানুষের ভূমিকা গ্রহণ করে— কঠোর বাধানিষেধ জারি করেছে। অনূর্ধ্ব চোদ্দো তো বটেই, এমনকি আঠারো বছরের কমবয়সিদের ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এমন বট ব্যবহারে; প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিভিন্ন নিয়মবিধি। উল্লিখিত মেয়েটি তৈরি করেছিল এক চ্যাটবট-বান্ধবী, এবং সেই যন্ত্র-বান্ধবীর সঙ্গে গত সওয়া এক বছরে তার যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তা নিবিড় প্রেমের। মেয়েটি জানিয়েছে, বাস্তব প্রেমিকার সঙ্গে এই চ্যাটবটের বিন্দুমাত্র ফারাক ছিল না তার কাছে। বিভিন্ন গবেষণা বলছে, এই মেয়েটি একা নয়— বহু মানুষই এমন ভাবে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন এই গোত্রের চ্যাটবটের সঙ্গে। কেবল প্রেমের সম্পর্কই নয়, চ্যাটবট কারও কাছে বন্ধু, কারও কাছে আত্মীয়, কারও আবার মা-বাবার ভূমিকাও পালন করছে। গবেষণা বলছে, যে মানুষ যত একা, এমন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও তার তত বেশি; এবং, যে দেশে বা সমাজে সামাজিক একাকিত্ব যত তীব্র, সেখানে এমন যন্ত্র-সম্পর্ক গড়ে ওঠে বেশি। এই কথাটি অবশ্য গবেষণা ছাড়াও আঁচ করা যায়। বস্তুত, গোটা দুনিয়াতেই একাকিত্ব এবং সম্পর্কহীনতা ক্রমে মহামারির আকার ধারণ করছে। ফলে, চ্যাটবটের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নটি অদূর ভবিষ্যতেই আরও অনেক বড়, অনেক বেশি বৈশ্বিক আকার ধারণ করবে।
এই সম্পর্কের অসমতা প্রশ্নাতীত। যাঁরা এ ভাবে মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপের পর্দায় ভেসে ওঠা চ্যাটবটকেই নিজের সঙ্গী বা পরমাত্মীয় জ্ঞান করছেন, তাঁদের একাকিত্বজনিত অসহায়তা চরম। তাঁদের সঙ্গী প্রয়োজন, অথবা বাস্তব জীবনে সঙ্গী বা বন্ধু জোগাড় করার সাধ্য বা পরিস্থিতি নেই। চ্যাটবটের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে কোনও বিশেষ ক্ষমতার প্রয়োজন পড়ে না, ফলে এটিই তাঁদের কাছে সহজ পথ। কিন্তু, সেই সম্পর্কের উল্টো দিকে রয়েছে যন্ত্র, যা চালিত হয় ব্যবসায়িক স্বার্থ দ্বারা। সেই ব্যবসায়িক স্বার্থের কাছে চ্যাটের বিপরীত প্রান্তে থাকা মানুষটির আবেগ, একাকিত্ব বা অসহায়তা নিতান্ত পুঁজি। তার থেকে সর্বাধিক পরিমাণ মুনাফা অর্জন করা ব্যতীত এই ব্যবসার আর কোনও উদ্দেশ্য থাকতে পারে না। সরকারের উদ্বেগও সেই জায়গাতেই— এমন ‘অসম সম্পর্ক’ মানুষকে টেনে নিয়ে যেতে পারে চরম কোনও পরিণতির দিকে। চ্যাটবটের প্ররোচনায় আত্মহত্যার বহু ঘটনা ইতিমধ্যেই ঘটেছে। আর্থিক নথি বেহাত হওয়া, অথবা গোপনতম তথ্য ফাঁস করে ব্ল্যাকমেল, অথবা তথ্য বিক্রি হয়ে যাওয়া, সব রকমের বিপদের সম্ভাবনাই থাকছে। কাজেই, মানুষকে জেনেবুঝে এমন বিপদের পথে পা ফেলতে দেওয়া নিয়ে রাষ্ট্রীয় অস্বস্তিটি স্পষ্ট।
কিন্তু, উল্টো দিকেও প্রশ্ন রয়েছে। রাষ্ট্র তো প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের অভিভাবক নয়। নাগরিক নিজের জীবন নিয়ে কী করবে, কোন সম্পর্কে জড়াবে বা জড়াবে না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কি রাষ্ট্রের থাকতে পারে? এ-হেন চ্যাটবটের সঙ্গে সম্পর্কের বিপদের কথা রাষ্ট্র মানুষকে জানাতে পারে, সতর্ক করে দিতে পারে। কিন্তু, সেই তথ্য সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অবহিত হওয়ার পরও যদি কোনও মানুষ এমন সম্পর্কে জড়াতে চান, রাষ্ট্র তাঁর সেই ব্যক্তি-স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারে কি? যদি যন্ত্রের বদলে এমন কোনও মানুষের সঙ্গে কারও প্রেম হয়, যার ঠিক একই রকম অসদুদ্দেশ্য রয়েছে, রাষ্ট্র কি তখন বাধা দিতে যাবে? তা হলে যন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেই বা অবস্থান ভিন্নতর হবে কেন? ব্যক্তি অধিকারে বিশ্বাসী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে এই প্রশ্নগুলির উত্তরও অদূর ভবিষ্যতে খুঁজতেই হবে।