অধ্যয়নই ছাত্রদের তপস্যা, বিদ্যালয় তপোভূমি— ভারতীয় সমাজের বিশ্বাস এমনই। স্কুল মূল্যবোধ শেখারও জায়গা; শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার পাঠ দেওয়া হয় সেখানে। শিশু-কিশোর মন সব সময় যে তা মানতে চাইবে তা নয়; সে কারণেই তারা অনেক সময় এমন আচরণ বা কাজ করে যা কর্তৃপক্ষের চোখে অবাধ্যতা— যেমন, ছেলেদের চুল বড় রাখা। এর বিরুদ্ধে রাজ্য শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশনে একাধিক আবেদন জমা পড়েছিল কেরলে, তার শুনানিতে সেখানকার কমিশন নির্দেশ দিল— স্কুলছাত্ররা নিজেদের পছন্দমতো লম্বা চুল রাখতে পারবে; চুলের দৈর্ঘ্যের কারণে তাদের হেনস্থা করা, ক্লাস থেকে বার করে দেওয়া বা শাস্তি দেওয়া চলবে না। কমিশন এক ধাপ এগিয়ে অল্পবয়সিদের যৌন পরিচয়ের প্রসঙ্গও সামনে এনে বলেছে, লিঙ্গ বা যৌন পরিচয় সম্পর্কে এখনও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে না-পৌঁছনো পড়ুয়ারা নিজেদের পছন্দমতো চুল রাখতে ও পোশাক বেছে নিতে পারবে। স্কুল কর্তৃপক্ষের সেই ‘অধিকার’-এ হস্তক্ষেপ বাঞ্ছনীয় নয়, তাঁরা এই পড়ুয়াদের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের দিকে নজর না দিয়ে বরং এরা কেমন পড়াশোনা করছে, এদের ব্যক্তিত্ব, মানবিক মূল্যবোধ গড়ে উঠছে কি না, সে দিকে মন দিন।
এই নির্দেশ শিশুদের মর্যাদা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার স্বীকৃতি। ভারতীয় সমাজে ছোটদের ‘ছোট’ বলে দেখার মানসিকতা একুশ শতকেও যায়নি। ধরেই নেওয়া হয়, ছোটরা কী পরবে, কী খাবে, কোথায় যাবে, সবই ঠিক করে দেবেন বড়রা। ছোটদের জীবন-অভিজ্ঞতা কম, সে জন্যই বড়দের সাহায্য প্রয়োজন— ঠিক কথা। কিন্তু অষ্টপ্রহর অভিভাবকত্বের নামে তাদের উপর সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব, ‘শিশু অধিকার’-এর পরিপন্থী। অথচ মা-বাবা, শিক্ষক, প্রতিবেশীরা তা বোঝেন না। এরই ফল চুল, পোশাক, খাবারের ব্যাপারে ছোটদের উপরে বড়দের নিদান। চুল ছোট না বড়, তা দিয়ে কোনও পড়ুয়ার চরিত্র, শৃঙ্খলাবোধ বা মেধার বিচার চলে কি? অথচ পরিবার ও সমাজের মূল্যবোধ টেনে এনে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ুয়াদের ব্যক্তিগত পছন্দ দমনের প্রবণতা দেখা যায়। বয়ঃসন্ধির ছেলেমেয়েদের লিঙ্গ ও যৌন পরিচয় নিয়ে কৌতূহল, সংশয় বা বিভ্রান্তি স্বাভাবিক। চুল বা পোশাকের ভিন্নতায় একটি কিশোর বা কিশোরী হয়তো সেই কৌতূহল বা সংশয়ের মুখোমুখি হচ্ছে, কিন্তু মা-বাবা বা স্কুল তা বুঝছে না, তাকে শাসন বা হেনস্থা করছে। কমিশনের নির্দেশে এখন যদি টনক নড়ে তো ভাল।
বিদ্যালয়ে নিয়ম থাকবেই, কিন্তু তার যুক্তি হতে হবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা— প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব প্রদর্শন নয়। কেরলের কমিশনও ছাত্রদের চুল বড় রাখার স্বাধীনতাকে অবাধ ছাড়পত্র দেয়নি; বলেছে, চুল পরিষ্কার রাখতে হবে, তা চোখ-মুখ ঢেকে ফেললে চলবে না, কারণ পড়ুয়াদের পরীক্ষাগারে, খেলার মাঠে, ব্যবহারিক ক্লাসেও থাকতে হয়। চুলে ক্ষতিকর রাসায়নিক ও রং ব্যবহারেও সতর্ক করেছে কমিশন। এই সবই বলে, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও দায়িত্ববোধ পরস্পরবিরোধী নয়; শিক্ষার উদ্দেশ্য এই দুইয়ের ভারসাম্য শেখানো। কমিশন মন্তব্য করেছে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে রাজ্যের শিক্ষা দফতর ও সিবিএসই-র সুস্পষ্ট নির্দেশিকা না থাকার কথাও। প্রয়োজন এমন বিধি, যা সবার ক্ষেত্রে ন্যায্য। শিশুকে সম্মান করতে শেখানো জরুরি, তাকে সম্মান দেওয়া তার চেয়ে কম জরুরি নয়।