E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

পাশ-ফেল সংবাদ

বরং বিপরীত সন্দেহই ক্রমশ গাঢ় হয়েছে অভিভাবকদের মধ্যে— পাশ-ফেল না থাকায় শিক্ষকেরা শেখানোর তাগিদ অনুভব করছেন না, দুর্বল ছাত্রদের প্রতি তাঁরা যথেষ্ট যত্নবান হচ্ছেন না।

শেষ আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:৫৪
প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

পশ্চিমবঙ্গের স্কুলে পাশ-ফেল ফেরানো হতে পারে, এমন ইঙ্গিত এল প্রশাসনের শীর্ষ স্তর থেকে। এই প্রস্তাব অকস্মাৎ নয়। শিক্ষার অধিকার আইন (২০০৯) অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে কোনও ছাত্রছাত্রীকে একই শ্রেণিতে আটকে রাখা নিষিদ্ধ করেছিল, কিন্তু ২০১৯ সালে সেই আইনে সংশোধন করে পঞ্চম এবং অষ্টম শ্রেণিতে বার্ষিক পরীক্ষার বিধান যোগ করা হয়। তবে বলা হয়, অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীদের অতিরিক্ত পাঠদান, এবং ফল প্রকাশের দু’মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষায় বসার সুযোগ দিতে হবে। তার পরেও ব্যর্থ হলে তাদের সেই শ্রেণিতে রেখে দেওয়া হবে। তবে এই ব্যবস্থা গৃহীত হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত রাজ্যগুলির উপরেই ছেড়ে দিয়েছিল কেন্দ্র। পশ্চিমবঙ্গে এখনও অবধি সেই নিয়ম কার্যকর করা হয়নি। তাই নবম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম পাশ-ফেলের সম্মুখীন হয় ছাত্রছাত্রীরা। জাতীয় শিক্ষানীতি (২০২০) তৃতীয়, পঞ্চম এবং অষ্টম শ্রেণিতে মূল্যায়নের কথা বললেও, পরীক্ষাকে অক্ষরপরিচয়ের ক্ষমতা, গণনায় দক্ষতা, ধারণাগত জ্ঞান এবং তার প্রয়োগের ক্ষমতা যাচাইয়ের উপায় বলে দেখেছে, মুখস্থবিদ্যা যাচাই করার জন্য নয়। অর্থাৎ মূল্যায়নব্যবস্থার সংস্কার করতে বলেছে। উপরন্তু, স্কুলের মূল্যায়নের জন্যেও পরীক্ষার ফলাফলকে ব্যবহার করতে বলেছে। সমস্যা এই যে, এ ভাবে পরীক্ষাকে দেখার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। স্কুলের পরীক্ষার ফলকে শিশুর সাফল্য-ব্যর্থতা, এমনকি তার পরিবারের সাফল্য-ব্যর্থতা বলে দেখার অভ্যাসটিই গড়ে উঠেছে। শ্রেণিগত পরীক্ষার ফল থেকে শিক্ষা নিয়ে স্কুল তার পঠনপাঠনের রীতিতে বদল এনেছে, এমন নজির বিরল।

বরং বিপরীত সন্দেহই ক্রমশ গাঢ় হয়েছে অভিভাবকদের মধ্যে— পাশ-ফেল না থাকায় শিক্ষকেরা শেখানোর তাগিদ অনুভব করছেন না, দুর্বল ছাত্রদের প্রতি তাঁরা যথেষ্ট যত্নবান হচ্ছেন না। শিক্ষার অধিকার আইন পরীক্ষার পরিবর্তে ধারাবাহিক মূল্যায়নের সুপারিশ করেছিল। কিন্তু সেই মূল্যায়নের ফলাফল যে ভাবে লেখা হয় তাতে অভিভাবকদের কাছে স্পষ্ট হয় না যে সন্তান কতটুকু শিখতে পেরেছে। এর ফলে সাবেক পাশ-ফেল প্রথা ফেরানোর দাবি উঠেছে অভিভাবকদের একটি বড় অংশের মধ্যে থেকে। শিক্ষক সংগঠনগুলির একাংশও পাশ-ফেলকে সমর্থন করছে, কারণ গত বছর দশেকে বিভিন্ন ধরনের মূল্যায়ন থেকে বার বার প্রকাশ পেয়েছে যে নিয়মিত স্কুলে গিয়েও পড়াশোনায় শ্রেণি-উপযোগী দক্ষতা রপ্ত করতে পারছে না শিশুরা। অষ্টম শ্রেণিতেও বহু পড়ুয়ার সাবলীল ভাবে পড়া, সরল বাক্য লেখা কিংবা গুণ-ভাগ করতে পারার ক্ষমতা জন্মাচ্ছে না। পাশ-ফেল প্রথা ফিরিয়ে আনলে ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষক, দু’তরফেই সতর্কতা বাড়বে, লেখাপড়ায় অবহেলা কমবে, এমনই হয়তো আশা করছেন পাশ-ফেল সমর্থকরা। যদিও শিক্ষানীতির বর্তমান কাঠামোর মধ্যে পাশ-ফেল চালু করতে চাইলে অকৃতকার্য ছাত্রছাত্রীদের অতিরিক্ত পাঠদান, এবং দ্বিতীয় একটি পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা করতে হবে। কী করে তা করবে স্কুলগুলি, যেখানে সাধারণ শ্রেণিকক্ষই শূন্য থাকছে?

ফিরে আসছে পুরনো উদ্বেগও। ভারতে বহু ছাত্রছাত্রী স্কুলছুট হয়ে যায়, বিশেষত ছেলেরা। দেখা গিয়েছে, এর অন্যতম কারণ পরীক্ষায় ফেল করার হতাশা, লজ্জা। পড়ুয়াদের স্কুলে ধরে রাখার তাগিদ ছিল পাশ-ফেল প্রথা তুলে দেওয়ার এক প্রধান কারণ। গত দু’দশকে সরকারি স্কুলগুলির পরিকাঠামো দুর্বল হয়েছে, কমেছে শিক্ষকের সংখ্যা, অথচ তার শাস্তি বহন করতে হচ্ছে ছাত্র-ছাত্রীদের। যাদের একটা বড় অংশ আসে দরিদ্র পরিবার থেকে। এই অন্যায় ব্যবস্থার জন্যও ফেল করানোর বিরোধিতা করছেন শিক্ষকদের একাংশ। তবে মূল প্রশ্নটি শুধু নৈতিকতার নয়, কার্যকারিতার। পাশ-ফেল পুনরায় চালু করলেও শিক্ষা-সঙ্কটের সমাধান হবে না, যদি না স্কুলশিক্ষার বিভিন্ন ঘাটতি পূরণ করা হয়। সরকারের ব্যর্থতাকে যেন শিশুদের ব্যর্থতায় পর্যবসিত করা না হয়।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
New Education Policy

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy