E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

চুক্তি পেরিয়ে

গত বছর ভারতে সবুজ বিপ্লবের অন্যতম রূপকার এমএস স্বামীনাথনের জন্ম-শতবর্ষ পালিত হল। তাঁকে মরণোত্তর ‘ভারতরত্ন’ সম্মান দেওয়া হল, তাঁর নামে চালু হয়েছে নানা পুরস্কার।

শেষ আপডেট: ১২ অক্টোবর ২০২৬ ০৫:০৫

ভারতের অর্থনীতির উদারীকরণ (১৯৯১) ৩৫ বছরে পড়ল। তাই হিসাব কষা চলছে, শিল্প বা পরিষেবা ক্ষেত্রের তুলনায় বিশ্বায়নের নীতিতে কৃষিক্ষেত্রে লাভ হয়েছে কতটুকু। চাষির সরকার-নির্ভরতা আগের তুলনায় কমেছে, অথবা বিদেশের বাজারে ভারতের কৃষি-উৎপাদনের চাহিদা বেড়েছে, এমন দাবি আজও করা চলে না। বরং অর্থনৈতিক সংস্কারের পর শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্রের দ্রুত বৃদ্ধি হওয়ায় মোট জাতীয় উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির ভাগ কমে এসেছে। অথচ, এখনও গ্রামাঞ্চলে অধিকাংশ মানুষের জীবিকা কৃষিকাজ। কৃষিতে সংস্কারের চিত্রটি জটিল। ভারতের চাষিকে ‘সুরক্ষিত’ রাখতে মুক্ত বাণিজ্যের চুক্তিগুলিতে ভারত সরকার বরাবরই ধান-গমের মতো প্রধান শস্য, তৈলবীজ, দুধ প্রভৃতি পণ্যকে চুক্তির বাইরে রাখতে চেয়েছে। খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কৃষিপণ্য রফতানিতে রাশ টেনেছে। অপর পক্ষে, সরকার সংস্কার আনতে চাইলে কৃষক সংগঠনগুলি তীব্র আপত্তি করেছে, এবং ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে (এমএসপি) ফসলের সরকারি খরিদের দাবিকে প্রবল ভাবে তুলে ধরেছে। কৃষক আন্দোলনের প্রতি নাগরিক সমাজের সহানুভূতি থাকলেও প্রশ্ন উঠেছে, করদাতার টাকায় চাষিকে সার-বিদ্যুতে ভর্তুকি, সুলভ ঋণ থেকে শুরু করে ফসলের ক্রয়, মজুত ও বণ্টনের বিপুল ব্যয় অনির্দিষ্ট কালের জন্য জুগিয়ে যাওয়াই কি উপযুক্ত নীতি?

গত বছর ভারতে সবুজ বিপ্লবের অন্যতম রূপকার এমএস স্বামীনাথনের জন্ম-শতবর্ষ পালিত হল। তাঁকে মরণোত্তর ‘ভারতরত্ন’ সম্মান দেওয়া হল, তাঁর নামে চালু হয়েছে নানা পুরস্কার। কিন্তু ভারতে কৃষির সংস্কারের জন্য যে প্রস্তাবগুলি তিনি রেখেছিলেন দু’দশক আগে, তা কত দূর বাস্তবায়িত করা গিয়েছে? স্বামীনাথনকে মনে রাখা হয়েছে প্রধানত এমএসপি নির্ধারণে তাঁর ‘ফর্মুলা’-র জন্য। তাঁর নেতৃত্বে ‘ন্যাশনাল কমিশন অন ফার্মার্স’ প্রস্তাব দিয়েছিল চাষের খরচের মধ্যে জমির ভাড়াকেও ধরে, মোট উৎপাদন খরচের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি দাম ধার্য করতে। সরকার সেই ফর্মুলা গ্রহণ করেনি। সব ধরনের ফসলকে সরকারি খরিদের অধীনে নিয়ে আসার প্রস্তাবটিও বাস্তবায়িত হয়নি, ধান ও গমই প্রধানত কেনা চলছে। আরও কুড়িটি ফসলের নাম ঘোষিত হলেও বাস্তবে কিছু অঞ্চলে, কিছু পরিমাণে তা কেনা হয়। সর্বোপরি, কৃষি জমি সুষম বণ্টন, সেচের জন্য বর্ষার জলের সুরক্ষা, তার যথাযথ ব্যবহারের জন্য যে প্রস্তাবগুলি স্বামীনাথন দিয়েছিলেন, সেগুলি গুরুত্ব পায়নি। সরকার এখনও বৃহৎ সেচ প্রকল্পে বিপুল ব্যয় করছে, কিন্তু বর্ষা-নির্ভর চাষিদের জন্য জল সংরক্ষণ, জল-ব্যবহারের বিকেন্দ্রিত ব্যবস্থা, গ্রামে গ্রামে পানি-পঞ্চায়েতের ব্যবস্থার ধারণাকে মান্যতা দেয়নি। চাষিরা যাতে বাজার ধরতে পারেন, তার জন্য ফসল সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, ‘গ্রেড’ অনুসারে ভাগ এবং ‘ব্র্যান্ডিং’ করা, ক্রেতা-চাষি সংযোগ, কৃষি-বিপণনের পরিকাঠামোর উন্নতি, এ সবই ছিল স্বামীনাথনের মননে। পরবর্তী কালে কেন্দ্রীয় সরকার নানা পরিকল্পনা, বাজেট বক্তৃতায় এই ধারণাগুলি উল্লেখ করেছে, কিন্তু বিনিয়োগ করেছে অতি সামান্য।

এমন নানা কারণের ফলে ভারতের চাষি মুক্ত বাণিজ্যের নীতি থেকে খুব সামান্যই লাভ পেয়েছে। কৃষি উৎপাদনের বাজারমূল্যের নিরিখে ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষি উৎপাদক, কিন্তু বিশ্ব-বাজারে কৃষিপণ্য রফতানির মাত্র ২.২ শতাংশ রয়েছে ভারতের দখলে। ভারত যত পণ্য রফতানি করে, কৃষিপণ্য তার ১২ শতাংশও নয়। অথচ, দেশ-বিদেশের বাজারের প্রতিযোগিতায় যোগ না দিলে ভারতের চাষির রোজগার বাড়বে না। বিশেষত উচ্চ মূল্যের কৃষিপণ্যের বাজারে ভারতকে জায়গা করে নিতে হবে। তার জন্য কেবল চটজলদি চুক্তি করলেই চলবে না, কৃষি উৎপাদন, বিপণন নীতিতে সংস্কার চাই। বিশ্ব-বাণিজ্যের মুক্তি ও শক্তি পাওয়ার হকদার ভারতের চাষিও।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Indian Agricultural Indian Farmers Indian Economy

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy