সমগ্র দেশ জুড়ে যে শিক্ষার্থী-বিক্ষোভ চলছে, তা সর্বার্থেই অভিনব, সাড়া-জাগানো। কী ভাবে নবীন প্রজন্ম সরকারকে বার্তা দিচ্ছে, তা নিয়ে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে ইতিমধ্যেই দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে (‘মুষ্টিবদ্ধ হাত’, ২৭-৮)। এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, শিক্ষার ভয়াবহ হালের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষান্তে কর্মসংস্থানের ভয়াবহতর হাল। এবং সেই হতাশা ও দিশাহীনতাও কিন্তু জেন-জ়ি ও জেন-আলফা’কে ক্রমাগত বিক্ষোভের পথে টেনে নিয়ে আসছে। ভারত গত আট দশকে অনেক দুঃসময় দেখেছে, তবে নিঃসন্দেহে এখনকার সময় বৃহৎ সঙ্কটময় পর্বের মধ্যে ইতিহাসে গণ্য হতে চলেছে। নীতি আয়োগের সাম্প্রতিক তথ্য দেখাচ্ছে ভারতের তরুণসমাজের এক বিরাট অংশ কর্মহীন। স্নাতকদের মধ্যে কর্মহীনতা জাতীয় কর্মহীনতার গড়ের তুলনায় চার গুণ বেশি। দ্বিতীয়টি ৩ শতাংশের একটু উপরে, আর প্রথমটি ১৩ শতাংশের উপরে, এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশের উপরে। মাত্র ৮ শতাংশের কিছু বেশি স্নাতক তাঁদের শিক্ষামান অনুযায়ী চাকরি পেয়েছেন, বাকিরা যোগ্যতার চেয়ে অনেক কমেই জীবিকা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। এই সংখ্যাগুলি এক ভয়াবহ বাস্তবের দিকে নির্দেশ করে। এ কোনও বিরোধী গোষ্ঠীর উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার নয়, কেন্দ্রীয় সরকারের নিজের তথ্যই এই কথা বলছে।
এক দিকে কর্মসংস্থানের অভাব, অন্য দিকে শিক্ষাক্রমের মধ্যে চাকরি-নিয়োগের উপযোগী দক্ষতা নির্মাণের অভাব, এই দুই মিলে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির উদ্ভব। ৮০ শতাংশ উচ্চশিক্ষার্থীর কাছে কাজের বাজারের কোনও অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সুযোগ নেই, যা তাদের পরবর্তী কালে কাজের বাজারের জন্য যোগ্যতা তৈরিতে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যাঁরা কাজ জোগাড় করতে পারছেন, তাঁরাও পরবর্তী কালে মুশকিলে পড়ছেন, কেননা প্রথম নিয়োগের অর্থই যে কাজের বাজারে স্থায়ী স্থান অর্জন করা, তা নয়, এবং পরবর্তী নিয়োগের স্থানের বিশেষ অসঙ্কুলান। বিপুল পরিমাণ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কারণে এখন উচ্চশিক্ষায় খরচ সমানেই ঊর্ধ্বমুখী, এবং কর্মসংস্থানের অভাব ও অতিরিক্ত কর্মসন্ধানীর সংখ্যা-হেতু বেতনহার সমানেই নিম্নমুখী— সব মিলিয়ে যা শিক্ষার প্রতি বীতরাগ এবং হতাশা সারা দেশে দাবানলের মতো ছড়িয়ে দিচ্ছে। প্রজন্মগত হতাশা হিসাবে একে দেখা হলেও বর্তমান শিক্ষাসঙ্কট আসলে এক বিরাট অর্থনৈতিক সঙ্কটের রূপ ধারণ করছে— শাসকমহল যে বিষয়ে হয় অনেকাংশে উদাসীন, নয়তো অনবহিত, নয়তো ইচ্ছাপূর্বক তা চেপে রাখতে ব্যস্ত।
সম্ভবত এমন সঙ্কটের সময় অন্য দেশ, বা অন্যান্য মডেল থেকে কিছু শিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন। সরকারি দফতরগুলি গতানুগতিক ভাবে নীতি প্রণয়ন ও নীতি বাতিলেই অভ্যস্ত, তাই এই কাজটিতে নীতি আয়োগের বিশেষ ভাবে মনোনিবেশ করা দরকার। কোনও বিশেষ বিভাগের উপরে উঠে সার্বিক নীতি প্রণয়ন জরুরি। মানবসম্পদ উন্নয়নের ভবিষ্যৎ রূপরেখা কল্পনা করা জরুরি। সাম্প্রতিক নীতি আয়োগ রিপোর্ট সে দিকেই নির্দেশ করছে— এ এক সুসংবাদ। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই-এর তীব্র গতি মনে রেখে কোন কোন ক্ষেত্রে কোন ধরনের শ্রমনিবিড়তা সম্ভব, সেই বিবেচনা কেবল নীতিনির্মাণের বন্ধ ঘরে আটকে না রেখে বিশদ ভাবে প্রকাশ ও প্রচার করলে সর্বসমাজের মঙ্গল।