E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

নথিসঙ্কট

কোনও বিদেশি যদি মিথ্যা পরিচয়ে বা অবৈধ উপায়ে ভারতে থাকেন, তাঁদের সম্পর্কে পদক্ষেপ করা জরুরি, এ কথা সংশয়াতীত। তদুদ্দেশ্যে নতুন কর্মপদ্ধতিও ভাবা দরকার।

শেষ আপডেট: ০৩ অগস্ট ২০২৬ ০৬:৫১
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

ভুলকে ঠিক করতে গেলে যদি আরও ভুল কিংবা অন্যায় ঘটে যায়, তা হলে ভুল ঠিক হয় কি? সম্প্রতি জন্ম ও মৃত্যু শংসাপত্র নিয়ে যে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে এই প্রশ্ন। বিগত সরকারের আমলে দুর্নীতির প্রবাহের মোকাবিলা বর্তমান সরকার কী ভাবে করবে, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কিন্তু মোকাবিলার পন্থা দিয়ে সাধারণ মানুষকে দ্বিগুণ বেগে নাকাল করা যায় কি না, সেটাও সমধিক, কিংবা ততোধিক, গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। রাজ্য সরকারের মুখ্যসচিব মনোজ অগ্রবাল জানিয়েছেন, গত বৎসরাধিক কালে যে হেতু জন্ম-মৃত্যুর শংসাপত্র নিয়ে অনেক গরমিল, অনিয়ম ও দুর্নীতির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে, রাজ্যে শংসাপত্র দেওয়ার নিয়ম গোড়া থেকে পাল্টানো হল। আগের রীতি-অনুযায়ী রাজ্যের পুরপ্রধান ও পঞ্চায়েত প্রধানরা, কিংবা কোনও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি আর এই শংসাপত্র দিতে পারবেন না। কেবল সরকারি আধিকারিকরাই পারবেন। এই বিধি অমান্য করলে কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণাও হয়েছে। রাজ্য জানিয়েছে ১৯৯৭ সাল থেকে নথিবদ্ধ হওয়া সব শংসাপত্র পুনর্যাচাই করবে সরকার, এবং সেই নব-সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে অভিন্ন তথ্যভান্ডার তৈরি হবে, যা কেন্দ্রের পোর্টালের সঙ্গে যুক্ত হবে। মুখ্যসচিব মনোজ অগ্রবালের মন্তব্য, “কোনও অবৈধ বিদেশি নাগরিক এখানে থাকতে পারবেন না।” এই মুহূর্তে হাতে-থাকা শংসাপত্র এখন বাতিলের পর্যায়ে। বিভিন্ন পুরসভা ও পঞ্চায়েত অফিসে ইতিমধ্যেই জন্ম-মৃত্যু নথিপত্র পরীক্ষা করছে পুলিশ। সেই পরীক্ষার প্রক্রিয়ায় নতুন বা সংশোধিত শংসাপত্র প্রদান আপাতত বন্ধ হয়েছে। বিদেশ যাওয়ার জন্য, পাসপোর্ট পাওয়ার লক্ষ্যে, সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করার জন্য, বা অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে এগুলি অত্যাবশ্যক, ফলত প্রত্যহ সংশ্লিষ্ট বিভাগে অসংখ্য অসহায় মানুষের ভিড় ক্রমশ বাড়ছে।।

কোনও বিদেশি যদি মিথ্যা পরিচয়ে বা অবৈধ উপায়ে ভারতে থাকেন, তাঁদের সম্পর্কে পদক্ষেপ করা জরুরি, এ কথা সংশয়াতীত। তদুদ্দেশ্যে নতুন কর্মপদ্ধতিও ভাবা দরকার। কেন্দ্রীয় সরকার যে অবৈধ অনুপ্রবেশের কথা বলে আসছে, তার তথ্যাদি এখনও অসম্পূর্ণ, তবু যত পরিমাণেই হোক না কেন, বহুদশকব্যাপী অনুপ্রবেশ সমগ্র দেশের নিরাপত্তার পক্ষেই বিপজ্জনক। তবে কিনা, অনুপ্রবেশ আটকানোর প্রক্রিয়ায় ভারতের নিজস্ব বাসিন্দাদের সন্দেহ করা, এবং সন্দেহ নিরসনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব সেই বাসিন্দাদের উপরেই চাপিয়ে দেওয়া সঙ্গত ও নৈতিক কাজ কি না— এই প্রশ্ন তোলাও জরুরি। গত কয়েক বছর ধরে ভারতের সব মানুষের উপরেই চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে একটি দায়— তাঁদেরই প্রমাণ করতে হবে তাঁরা ভারতের নাগরিক না কি অবৈধ বিদেশি নাগরিক। একের পর এক সরকারি নথি নাগরিকত্বের যথেষ্ট প্রমাণ নয় বলে ঘোষিত হওয়ায় সাধারণ নাগরিকের হতাশ ও হতাশ্বাস লাগতেই পারে এই ভেবে যে, কোন নথি দিয়ে তাঁরা নাগরিকত্ব প্রমাণ করবেন। এই সূত্রে জন্ম-মৃত্যু শংসাপত্রের বড় গুরুত্ব তৈরি হয়েছিল সম্প্রতিকালে। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যালয় সার্টিফিকেটের ভিত্তি হিসাবে জন্ম শংসাপত্র ব্যবহৃত হয়। পারিবারিক রক্তসংযোগসূত্র প্রতিষ্ঠার জন্য মৃত্যু শংসাপত্রের প্রয়োজন হয়।

লক্ষণীয়, সম্প্রতিকাল শব্দটি। কারও অজানা নয় যে ভারতের মতো অতি জনবহুল দেশে এই প্রথা এতগুলি দশক ধরে ঠিকমতো অনুসৃত না হওয়ায় বহু মানুষের শংসাপত্র পাওয়া ও রাখার অভ্যাস নেই, বিশেষত দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে। এখনও দেশের অনেক মানুষের অস্তিত্ব অনেকাংশে নথি-নিরপেক্ষ। এই পরিস্থিতির প্রধান দায় নাগরিকের নয়, রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রের দায় নাগরিকের উপর চালান করার প্রবণতাটি অতি সঙ্কটজনক। তদুপরি, এখন যে পরিমাণ নাগরিকের দায় কতিপয় আধিকারিকের উপর ন্যস্ত হল, তাতেও কর্মসিদ্ধির বিপুল আশঙ্কা। সব মিলিয়ে নাগরিক প্রাণ ওষ্ঠাগত।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Central Government

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy