E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

ক্ষোভ-বিস্ফোরণ

সম্মিলিত বিক্ষোভের মুখে সরকার শ্রমিকদের ‘আইনলঙ্ঘনকারী,’ ‘অপরাধী’ বলে চিহ্নিত করতে চেয়েছে।

শেষ আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:১৪

নয়ডায় শ্রমিক আন্দোলনের তীব্রতার সামনে দাঁড়িয়ে ন্যূনতম মজুরি বাড়াতে বাধ্য হল উত্তরপ্রদেশ সরকার। কয়েক হাজার শ্রমিকের এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়— ফেব্রুয়ারির গোড়ায় বিহারের বরৌনিতে ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন লিমিটেড (আইওসিএল)-এর তেল শোধনাগারে কর্মরত কয়েক হাজার চুক্তি-শ্রমিক ধর্মঘট করেন। দাবির মধ্যে ছিল বেতন বাড়ানো, কাজের সময়সীমা কমানো, কর্মক্ষেত্রে পরিবেশের উন্নতি। ফেব্রুয়ারির শেষে পানিপথে আইওসিএল-এর প্রায় তিরিশ হাজার কর্মী একই দাবিতে ধর্মঘট করেন। প্রায় একই সময়ে গুজরাতের সুরাতে একটি বেসরকারি বৃহৎ নির্মাণ সংস্থার পাঁচ হাজার চুক্তি-শ্রমিক কাজ বন্ধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। নয়ডার পোশাক রফতানি শিল্প এবং গাড়ির যন্ত্রাংশ নির্মাণ শিল্পের চুক্তি-শ্রমিকদের ধর্মঘট সেই ধারারই সাম্প্রতিকতম আন্দোলন। বেতনবৃদ্ধির দাবিটির লক্ষ্য কেবল নিয়োগকর্তা নয়, রাজ্য সরকারও বটে। সংগঠিত শিল্পে শ্রমের মূল্য নির্ধারণের অন্যতম উপায়, পাঁচ বছর পর পর বেতনের ‘বেসিক’ অংশে পরিবর্তন। ন্যূনতম মজুরি আইন, ১৯৪৮-এর অন্তর্গত এই নির্দেশ নয়া শ্রম বিধিতেও (মজুরি সম্পর্কিত কোড, ২০১৯) বজায় রয়েছে। রাজ্যের শ্রম দফতরেরই দায়িত্ব বেতন বৃদ্ধি নির্ধারণ, বাস্তবে বহু রাজ্য ‘বেসিক পে’-র সংশোধন করে না। উত্তরপ্রদেশে অন্তত দশ বছর বেতন সংশোধন হয়নি। সম্প্রতি হরিয়ানা বেতন সংশোধন করে প্রায় ৩৫ শতাংশ বেতন বাড়িয়েছে। তার ফলেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে নয়ডায়। ও-দিকে বুধবার বিক্ষোভ দেখিয়ে গ্রেফতার হয়েছেন আশি জন মহিলা গিগ-কর্মী।

সম্মিলিত বিক্ষোভের মুখে সরকার শ্রমিকদের ‘আইনলঙ্ঘনকারী,’ ‘অপরাধী’ বলে চিহ্নিত করতে চেয়েছে। উত্তরপ্রদেশের শ্রমমন্ত্রী অনিল রাজভর এই বিক্ষোভকে ‘পাকিস্তানের ষড়যন্ত্র’ বলেও অভিহিত করেছেন। পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা শান্তিপূর্ণ অবস্থানকারীদের উপরেও বলপ্রয়োগ করেছে, আন্দোলনকারী নেতাদের গ্রেফতার করেছে। বিচার তার নিজস্ব গতিতে চলবে, কিন্তু এ প্রশ্নটিও করা চাই— কেন ন্যায্য বেতন, যথাযথ কর্ম-পরিবেশের দাবি পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ অবধি বার বার গড়ায়? নিজেদের বিপন্ন করে শ্রমিকরা যে সমস্যাগুলির কথা সামনে এনেছেন, সেগুলির গুরুত্ব কম নয়— উপরি মজুরি না দিয়ে আট ঘণ্টার বেশি কাজ করানো, কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষার অভাব, খাবারের সুব্যবস্থা না থাকা, মহিলা-কর্মীদের নিরাপত্তার অভাব। এই অভিযোগগুলি অমূলক নয়। বিশেষত কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কর্মীদের জীবনের ঝুঁকি কোন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে, তার প্রমাণ সম্প্রতি ছত্তীসগঢ়ের একটি বেসরকারি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বয়লার বিস্ফোরণ ঘটে কুড়ি জনেরও বেশি শ্রমিকের মৃত্যু। এ ক্ষেত্রেও দায়ী আইনের প্রয়োগে গাফিলতি, সব ধরনের কল-কারখানার নিরাপত্তা নিয়মিত পরিদর্শনের কথা শ্রম আধিকারিকদের। এ বিষয়ে আইন ক্রমশ নমনীয় হয়েছে, প্রয়োগ আরও শিথিল হয়েছে। ফলে বৃহৎ রাসায়নিক শিল্প, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে অবৈধ বাজি কারখানা, সর্বত্র বিপন্ন শ্রমিক।

কেন্দ্রীয় ইউনিয়নগুলি শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং বেতন বৃদ্ধির দাবিতে ধর্মঘট ডেকেছে। কিন্তু এই বিপর্যয়ের দায় শ্রমিক নেতারাও এড়াতে পারেন না। চুক্তির মাধ্যমে সংগঠিত ক্ষেত্রে, বৃহৎ শিল্পেও চুক্তি-কর্মী নিয়োগ বেড়েই চলেছে। আইন অমান্য করে শিল্পের মৌলিক (‘কোর’) দায়িত্বগুলিতেও নিযুক্ত করা হচ্ছে অস্থায়ী শ্রমিক। পিএফ, ইএসআই প্রভৃতি থেকে বঞ্চনার ‘সুবিধা’ পেতে চান নিয়োগকারী। শ্রমিক সংগঠনগুলি মুখে চুক্তি-কর্মীদের দাবির কথা বললেও কার্যক্ষেত্রে নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে দরদস্তুর করে সামান্যই। অতএব শ্রমিকদের ক্ষোভের অকস্মাৎ বিস্ফোরণই হয়ে দাঁড়িয়েছে ন্যায় পাওয়ার পথ। এই পরিস্থিতি শিল্প এবং শ্রমিক, কারও পক্ষেই ভাল নয়।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Uttar Pradesh Yogi Adityanath

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy