E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

কৌশলী মৈত্রী

লক্ষণীয়, চিনের উচ্চাভিলাষী ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর প্রধান সংযোগস্থল হওয়ায় পিওকে-র ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। মূলত মলাক্কা প্রণালীর উপর নির্ভরতা হ্রাস করে আরব সাগরের গ্বদর বন্দরে সরাসরি পৌঁছনোর লক্ষ্যেই ‘চিন-পাকিস্তান ইকনমিক করিডর’ (সিপিইসি) গড়ে তোলা হচ্ছে।

শেষ আপডেট: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৬:৩৩

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে চিন ও পাকিস্তানের সখ্য বরাবরই নতুন সমীকরণ সৃষ্টি করে। তেমনই ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত দুই দেশের সাম্প্রতিক ‘যৌথ সীমান্ত কমিশন’-এর প্রথম বৈঠক উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ভারতের। এই যৌথ সীমান্ত কমিশনের শিকড় প্রোথিত রয়েছে ১৯৬৩ সালের ঐতিহাসিক চিন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তির মধ্যে। তৎকালীন ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান ভারতের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের (পিওকে) অন্তর্গত কৌশলগত শাক্সগাম উপত্যকা চিনের হাতে তুলে দেয়। শুরু থেকেই এই চুক্তিকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে এসেছে ভারত। নয়াদিল্লির মতে, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের উপর ইসলামাবাদের কোনও সার্বভৌম অধিকারই নেই। যে-হেতু জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এই অঞ্চলই চিন ও পাকিস্তানকে ভৌগোলিক ভাবে আলাদা করে রেখেছে, তাই এই দুই দেশের মধ্যে কোনও বৈধ আন্তর্জাতিক সীমান্ত নেই। স্বাভাবিক ভাবেই, অবৈধ ভাবে দখল করা জমি নিয়ে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করার কোনও আইনি অধিকার পাকিস্তানের নেই। তাই ভারতের দাবি, এই তথাকথিত কমিশন ভারতের সার্বভৌমত্বে কোনও প্রভাব ফেলতে পারবে না।

লক্ষণীয়, চিনের উচ্চাভিলাষী ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর প্রধান সংযোগস্থল হওয়ায় পিওকে-র ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। মূলত মলাক্কা প্রণালীর উপর নির্ভরতা হ্রাস করে আরব সাগরের গ্বদর বন্দরে সরাসরি পৌঁছনোর লক্ষ্যেই ‘চিন-পাকিস্তান ইকনমিক করিডর’ (সিপিইসি) গড়ে তোলা হচ্ছে। ফলস্বরূপ, এই অঞ্চলের বিপুল পুঁজি ও কৌশলগত স্বার্থ সুরক্ষায় চিন এখন পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বিশেষ ভাবে আগ্রহী। বস্তুত, এই পদক্ষেপের নেপথ্যে চিনের সুনির্দিষ্ট সময় নির্বাচন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এক দিকে শি জিনপিংয়ের ভারত সফরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও সীমান্ত উত্তেজনা প্রশমনের বার্তা, অন্য দিকে পাকিস্তানের সঙ্গে চিনের যৌথ কমিশন গঠন— বেজিংয়ের এই দ্বিচারিতা তাদের দ্বিমুখী কৌশলেরই ইঙ্গিতবাহী। স্পষ্টতই, এর পিছনে ভারতের সার্বভৌমতাকে মান্য করার কোনও সূদূর পরিকল্পনা তো নেই-ই, এটি ভারতের উপর মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত চাপ বজায় রাখার দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। প্রথমত, এর মাধ্যমে পিওকে-তে পাকিস্তানের অবৈধ উপস্থিতিকে পরোক্ষ আন্তর্জাতিক মান্যতা দিয়ে ভারতের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করা। দ্বিতীয়ত, কারাকোরাম পাসের কাছে যৌথ উপস্থিতির মাধ্যমে ভারতের উত্তর ও পশ্চিম সীমান্তে একসঙ্গে ‘টু-ফ্রন্ট ওয়র’ বা দ্বিমুখী যুদ্ধের ভয় তৈরি করা।

ফলে, চিনের এই ‘সালামি স্লাইসিং’ বা ধাপে ধাপে জমি ও আইনি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার নীতি ভারতের জন্য এখন এক জটিল কূটনৈতিক পরীক্ষা। তবে, শুধু কূটনৈতিক আপত্তিতে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ভারতকে এখন সিপিইসি-বিরোধী বৈশ্বিক জনমত গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে পিওকে নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও আক্রমণাত্মক নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। বেজিং ও ইসলামাবাদের এই যৌথ আগ্রাসনকে রুখতে হলে দেশের সামরিক আধুনিকীকরণ ও সীমান্ত পরিকাঠামো উন্নয়নের গতিও বৃদ্ধি করা জরুরি। কূটনীতির টেবিলে বন্ধুত্বের ইঙ্গিতের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কৌশলগত ফাঁদ সম্পর্কে সতর্ক থাকাই এখন প্রধান কাজ।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Central Government India-Pakistan India-China Pakistan China

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy