সাম্প্রতিক শাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজ়েশন (এসসিও)-এর শীর্ষ বৈঠক এবং সেখানে গৃহীত ‘বিশকেক ঘোষণা’ বর্তমান বিশ্বরাজনীতির এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হল। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পশ্চিমের সঙ্গে চিন ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান দূরত্বের পটভূমিতে এই সম্মেলনটি কেবল একটি আঞ্চলিক মঞ্চ হিসেবে নয়, বরং একটি বিকল্প বৈশ্বিক মেরুকরণের কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সম্মেলনের রজতজয়ন্তী কালে বিশকেক ঘোষণার মূল প্রতিপাদ্য ছিল— আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যৌথ সংগ্রাম এবং অর্থনৈতিক একীকরণ। ঘোষণাপত্রে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ‘তিনটি অপশক্তি’— সন্ত্রাসবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং চরমপন্থার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা হয়। বিশেষত, সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ এবং রাষ্ট্রীয় মদতে পুষ্ট উগ্রবাদের বিরুদ্ধে যৌথ ব্যবস্থা গ্রহণের যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত অর্থবহ। পাশাপাশি, সদস্য দেশগুলির মধ্যে বাণিজ্যের সুবিধার্থে একটি পৃথক ‘উন্নয়ন ব্যাঙ্ক’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা এবং জাতীয় মুদ্রায় লেনদেন বৃদ্ধির প্রস্তাব অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার দিকে একটি বড় পদক্ষেপ বলেই মনে করা হচ্ছে।
তবে, এই ঘোষণার নেপথ্যে কাজ করছে এক সুদূরপ্রসারী ভূরাজনৈতিক কৌশল। পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞা এড়াতে রাশিয়া যখন মধ্য এশিয়ায় বাণিজ্য বাড়িয়ে অর্থনীতি রক্ষা ও নিজেদের ঐতিহাসিক প্রভাব ধরে রাখতে ব্যস্ত, তখন চিন হাঁটছে আরও বহুমুখী পথে। বেজিং তার উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর আওতায় মধ্য এশিয়াকে ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে সংযোগকারী একটি মূল অর্থনৈতিক করিডর হিসেবে গড়ে তুলছে। ভুললে চলবে না, এই অঞ্চলটি বিপুল জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের ভান্ডার হওয়ার পাশাপাশি কৌশলগত ভাবে পূর্ব ও পশ্চিমের সংযোগস্থলও। বিশকেক ঘোষণায় একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা এবং ডলার-বহির্ভূত বাণিজ্যের যে পরোক্ষ বার্তা রয়েছে, তা মূলত ওয়াশিংটনের আধিপত্য রুখতে মস্কো ও বেজিংয়ের একটি যৌথ প্রচেষ্টা। রাশিয়া এই অঞ্চলকে তার নিরাপত্তার ‘বাফার জ়োন’ ভাবছে, এবং চিন বিপুল অর্থলগ্নি করে দেশগুলিকে নিজের উপর নির্ভরশীল করে তুলছে।
পুরো সমীকরণটিতে ভারতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এক দিকে এসসিও-র পূর্ণ সদস্যপদ, অন্য দিকে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন ‘কোয়াড’ জোটে অংশগ্রহণ— এই দ্বিমুখী কৌশল দিল্লির কূটনৈতিক দক্ষতাকে এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিশকেক ঘোষণায় সংযোগ বৃদ্ধির কথা বলা হলেও, ভারত চিনের ‘বিআরআই’ প্রকল্পের বিরোধিতা করে আসছে, কারণ এর অংশ ‘চিন-পাকিস্তান ইকনমিক করিডর’ ভারতের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের উপর দিয়ে গিয়েছে। তৎসত্ত্বেও, বাণিজ্য বিস্তারের সূত্রে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন এবং পাকিস্তানের দিক থেকে আসা সন্ত্রাসবাদ দমনে এসসিও ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। বিশকেক ঘোষণা ইউরেশিয়ায় নতুন শক্তির ভারসাম্যের প্রতীক। ভারতকে এখন চিন-রুশ অক্ষের উপর নির্ভরশীল না হয়ে, মধ্য এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে মনোযোগী হতে হবে।