E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

তবুও প্রশ্ন

এ বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫-২৬’এর প্রথম ত্রৈমাসিকে জিডিপির পরিমাণ ৮০ লক্ষ কোটি টাকা। ব্যবধান ছ’লক্ষ কোটি টাকারও বেশি। গত অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকের জিডিপির অঙ্কটি যদি অপরিবর্তিত থাকত, বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে টাকার অঙ্কে জিডিপির বৃদ্ধির হার দাঁড়াত ২.৬ শতাংশে।

শেষ আপডেট: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৬:৫৬

২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে ভারতের জাতীয় আয় বৃদ্ধির প্রকৃত হার ৭.৮ শতাংশ, এ কথা ঘোষণা করে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ইজ়রায়েল-ইরান যুদ্ধ, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, ডলারের সাপেক্ষে টাকার দামের ধারাবাহিক পতন ইত্যাদির মধ্যেও যদি ভারতীয় অর্থব্যবস্থা সত্যিই এই হারে বৃদ্ধি পায়, তবে তা অবশ্যই গর্বের কথা। মুশকিল হল, এই সুসংবাদটিকে ঘিরে বহুবিধ প্রশ্ন উঠছে ঘোষণার পর থেকেই। ভারত সরকারের ভূতপূর্ব অর্থসচিব সুভাষচন্দ্র গর্গ যেমন প্রশ্ন করেছেন ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে জাতীয় আয়ের পরিমাণ নিয়ে। গত বছর অগস্টে সরকার জানিয়েছিল, চলতি মূল্যস্তরের নিরিখে সে ত্রৈমাসিকে জিডিপির পরিমাণ ৮৬.১ লক্ষ কোটি টাকা। আর, এ বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫-২৬’এর প্রথম ত্রৈমাসিকে জিডিপির পরিমাণ ৮০ লক্ষ কোটি টাকা। ব্যবধান ছ’লক্ষ কোটি টাকারও বেশি। গত অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকের জিডিপির অঙ্কটি যদি অপরিবর্তিত থাকত, বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে টাকার অঙ্কে জিডিপির বৃদ্ধির হার দাঁড়াত ২.৬ শতাংশে। তার থেকে মূল্যস্ফীতির হার বাবদ ২.৫ শতাংশ-বিন্দু বাদ দিলে প্রকৃত বৃদ্ধির হার পড়ে থাকত মাত্র ০.১%। গত বছরের হিসাবটি পাল্টে গেল কেন, সে প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে যে, এক দিকে হিসাবের ভিত্তিবর্ষ ২০১২-১৩ থেকে পাল্টে ২০২২-২৩ করা হয়েছে; আর অন্য দিকে, হিসাব পদ্ধতিতেও বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। তার ফলেই সংশোধিত অনুমান এতখানি কম। কথাটির মধ্যে পদ্ধতিগত সত্য কতখানি, তা জানার উপায় নেই— কারণ, জিডিপির সংশোধিত গণনাপদ্ধতি কেন্দ্রীয় সরকার এখনও প্রকাশ করেনি।

প্রধামনন্ত্রীর ভূতপূর্ব প্রধান আর্থিক পরামর্শদাতা অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যমের মতটি এই প্রসঙ্গে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, একটি ত্রৈমাসিকে জিডিপির অঙ্ক কত হল, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল সরকারের উপরে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। এই অনাস্থার সবচেয়ে বড় কারণ সরকারের তরফে অস্বচ্ছতা। জিডিপির মেথডোলজি বা হিসাবপদ্ধতি যেমন এখনও অপ্রকাশিত, ঠিক তেমনই গত এক যুগে বারে বারেই তথ্য গোপন করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। যখনই কোনও পরিসংখ্যান এই সরকারের উন্নতির আখ্যানের সঙ্গে মেলেনি, তখনই সেই পরিসংখ্যান অপ্রকাশিত থেকেছে, অথবা তার গুরুত্ব খর্ব করা হয়েছে নানা ভাবে। গত বছর আন্তর্জাতিক অর্থ ভান্ডারও ভারতের জাতীয় আয় গণনাপদ্ধতি বিষয়ে সমালোচনা করেছিল। স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতে বহু অভাব, বহু ঘাটতির মধ্যেও পরিসংখ্যান ছিল বিশ্বমানের। গোটা দুনিয়ায় তা সম্মান পেত। গত এক যুগে অমৃতকাল এসে সেই গর্বকে নিয়ে গিয়েছে।

ভিত্তিবর্ষ বা হিসাবপদ্ধতি সংক্রান্ত প্রশ্ন ও সংশয়ের বাইরেও কয়েকটি কথা বলার। প্রথমত, হিসাবে দেখা যাচ্ছে যে, নির্মাণ ক্ষেত্রে প্রকৃত বৃদ্ধির হার টাকার অঙ্কে বৃদ্ধির হারের তুলনায় বেশি। যে-হেতু টাকার অঙ্কে বৃদ্ধির হার থেকে মূল্যবৃদ্ধির হার বাদ দিয়ে প্রকৃত বৃদ্ধির হার পাওয়া যায়, তাই প্রথমটির চেয়ে দ্বিতীয়টি বেশি হতে পারে তখনই, যখন সেই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ডিফ্লেশন বা মূল্যসঙ্কোচন ঘটে। নির্মাণ ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। দ্বিতীয়ত, ভারতে জিডিপির বৃদ্ধির হারের সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগের বৃদ্ধির হারের অসঙ্গতি ক্রমে প্রকটতর হচ্ছে। বস্তুত, যত বিদেশি লগ্নি আসছে, তার অনুপাতে একটা বড় অংশ ভারত থেকে বাইরে চলে যাচ্ছে। এবং, তা শুধু বিদেশি পুঁজি তুলে নেওয়ার ফলে ঘটছে না— ভারত থেকে মূলধনের বহির্গমনের একটি বড় কারণ, ভারতীয় লগ্নিকারীরা বিদেশে বিনিয়োগ করছেন। এটা অর্থব্যবস্থার স্বাস্থ্যে গভীর আস্থার পরিচায়ক নয়। কাজেই, ভারতীয় অর্থব্যবস্থা ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, সে বিষয়ে সুগভীর উদ্বেগের কারণ রয়েছে— সমাজমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছাবার্তার পরও।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
GDP Growth rate India GDP Growth Rate Indian Economy GDP

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy