সংবাদের ইশারা-ইঙ্গিত ছিল যথেষ্টই, তবে সরকারি ভাবে সংবাদটি ঘোষিত ছিল না। অবশেষে অরুণাচল প্রদেশে সীমান্তে চিন-ভারত সংঘাতের কথা প্রকাশ্যে ঘোষিত হল। প্রথম বার আনুষ্ঠানিক ভাবে জানা গেল, পিপলস লিবারেশন আর্মির সঙ্গে ভারতীয় বাহিনীর রীতিমতো সঙ্কটময় সংঘাত তৈরি হয়েছে ইন্দো-তিব্বত সীমান্তে। ভারত তিব্বত সীমান্ত পুলিশ বা আইটিবিপি সরাসরি এ কথা জানানোর পর কেন্দ্রীয় বিদেশ মন্ত্রকও সেই বক্তব্য সমর্থন করেছে। স্বভাবতই দেশময় সাড়া উঠেছে, বিরোধীরা সরব হয়েছেন। পরিস্থিতি কতটা সঙ্গিন, এখনও পরিষ্কার না হলেও অরুণাচল প্রদেশে যে বেশ কয়েক মাস ধরে সঙ্কট চলছে, এবং ভারতের সশস্ত্র বাহিনী সেই সঙ্কট দূর করতে পারেনি— এটুকু স্পষ্ট। বিরোধী দলগুলির প্রাথমিক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রকের কাছ থেকে যে উত্তর পাওয়া গিয়েছে, তা প্রত্যাশিত ভাবেই ভাসা-ভাসা এবং অনিশ্চিত। অথচ দেশের শান্তি ও স্থিতির জন্য এখনই যেটা দরকার— তা হল পরিস্থিতি বিষয়ক স্পষ্ট তথ্য।
বিদেশ মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, চিন-ভারত সীমান্ত অঞ্চলে এমন অশান্তি নতুন নয়, ফলে বিচলিত হওয়ার কারণ নেই। এ কথা সত্য যে, সেই ১৯৬০-এর দশক থেকে ক্রমাগত ও বারংবার চিনের দিক থেকে সীমান্ত পার করে ভারতের ভূমিতে এগিয়ে আসার ঘটনা ঘটেছে, বারংবার তার প্রতিবাদে দুই দেশের মধ্যে অশান্তির আবহ তৈরি হয়েছে। বিশেষত অরুণাচল প্রদেশের প্রায় সমগ্র সীমানা বরাবর যে ভারত তিব্বত সীমান্তরেখা, সেখানে চিনের মনোভাব সর্বদাই আগ্রাসী। তিব্বতের উপর চিনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার কঠোর প্রকল্পের অংশ হিসাবেই এই সীমান্ত তাদের কাছে প্রত্যক্ষ আগ্রাসনের লক্ষ্য। একই কারণে, তিব্বত সংলগ্ন ভারতের কিছু অংশ চিনা ভূমির অংশ বলে তাদের বরাবরের দাবি। এই পরিস্থিতিতে অরুণাচলের স্থানীয় জনজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ অত্যন্ত বিপদগ্রস্ত থাকেন, এই অগম্য দুরূহ পার্বত্য অঞ্চলে তাঁদের বসতি থেকে শুরু করে পশুচারণভূমি, সব কিছুই দুই দেশের সার্বভৌমতার লড়াইয়ে নিয়মিত ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি তাঁদের স্বাভাবিক জীবিকানির্বাহই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এ বারেও তাই ঘটেছে। ফলে ভারতের কাছে এ নিশ্চয়ই নিছক কোনও বৈদেশিক সঙ্কট নয়— তার থেকে অনেকটা বেশি। সীমান্তের এ দিকে নিজভূমিতেও জনজাতিভুক্ত মানুষের জমি-জীবন রক্ষার প্রশ্নটি ভারতের কাছে অতি সংবেদনশীল। ভারতের এই সমস্যার কথা সহজেই অনুমেয় বলেই হয়তো চিনের উস্কানিও থাকতে পারে। সব মিলিয়ে অরুণাচল সীমান্ত এই মুহূর্তে অতীব সঙ্কটগ্রস্ত।
তবে যে দিকে এখনই দৃষ্টিপাত জরুরি, তা হল ভারত সরকারের তথ্য প্রকাশে অনীহা। আইটিবিপি-র ঘোষণার পর বিরোধী দলগুলি কংগ্রেসের নেতৃত্বে বার্তা দিয়েছে— সমস্ত তথ্য দেশবাসীকে জানাতে হবে। বলা বাহুল্য, এই বিরোধী উদ্বেগ ভিত্তিহীন নয়। এর আগে উত্তর-পূর্ব সীমান্তে ডোকলাম অঞ্চলে চিনা বাহিনীর ভূমিদখল বিষয়ে তথ্যগোপনের যে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল, তা এখন সর্বজ্ঞাত। অবশ্যই পুনর্বার তা কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না। বিশেষত এখন এমন এক সময় যখন এক দিকে চিনা বিনিয়োগের উপর বিধিনিষেধ শিথিল করা হচ্ছে, আবার অন্য দিকে চিনা আগ্রাসন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিরোধীরা সেই সুযোগের রাজনৈতিক ব্যবহার করবে, এটাই স্বাভাবিক। দেশের বিরোধী পরিসরে চিনের হস্তক্ষেপের আশঙ্কা নিয়ে অনেক সময়ই শাসক বিজেপির চিৎকৃত প্রচার শুনতে পাওয়া যায়, সাম্প্রতিক সিজেপি আন্দোলনের সময়ও শোনা গিয়েছে। বিপরীতে এখন চিনা আগ্রাসন ভারতীয় সার্বভৌমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে যদি বিরোধী প্রচার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, তা অত্যন্ত অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তাই জাতীয় স্বার্থেই বাস্তব সত্য প্রকাশ করা জরুরি, যাতে কোনও বিকৃত তথ্য প্রচারিত না হয়।