E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

যে নামেই ডাকো?

এ কথাও অনস্বীকার্য যে, নামের উপরে মানুষের ব্যক্তিগত, এবং শিশুর ক্ষেত্রে পরিবারের অধিকার চূড়ান্ত; এই পরিসরে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ নিতান্ত অনধিকারচর্চা।

শেষ আপডেট: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:০৬
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

রাজস্থান সরকার সরকারি ও বেসরকারি স্কুল-পড়ুয়াদের ‘বেমানান’, ‘নেতিবাচক’ নামগুলি পরিবর্তনে উদ্যোগী হয়েছে। অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনার পর বেশ কিছু নাম বদলের কথা ভাবা হয়েছে; যেমন শেরু, কালু, টিঙ্কু, শয়তান ইত্যাদি। শিক্ষা দফতর তিন হাজার বিকল্প নামের তালিকাও প্রস্তুত করেছে, অর্থব্যাখ্যা সমেত, যাতে মা-বাবা উপযুক্ত নাম নির্বাচন করতে পারেন। প্রয়োজনে পুরনো নথিপত্রে পরিবর্তনে সহায়তার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের যুক্তি, মানুষের নাম সামাজিক পরিচয় ও আত্মসম্মানের সঙ্গে জড়িত, ফলে অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে আশ্চর্য নাম দিয়ে দিলে শিশুর আত্মবিশ্বাস আহত হতে পারে। অতএব, অর্থবহ, ওজনদার নাম প্রয়োজন। ভাবনাটি কৌতূহলোদ্দীপক। পিতৃমাতৃপ্রদত্ত নামের কারণে শৈশব থেকে উপহাস, অস্বস্তি নিয়ে বেড়ে ওঠার দৃষ্টান্ত কম নয়; এই ঠাট্টা, ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃত বিকৃত উচ্চারণের ভার, নামের অর্থগত লঘুতা ব্যক্তির অসম্মান ও মানসিক যন্ত্রণার উৎস হয়। বহু লোকই পরিণত বয়সে নামবদলের সিদ্ধান্ত নেন, যা এই অভিঘাতের গুরুত্বকে প্রমাণিত করে। কেউ বলতে পারেন, সরকারের সিদ্ধান্ত বহু নাগরিককেই সেই অপমান, ও বিড়ম্বনা থেকে রক্ষা করবে। ঘটনা হল, পদবির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের এমন হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। শ্রেণিসূচক বা অবমাননাকর পদবির বর্জন ও সংশোধনের ব্যবস্থা, আইনি সহায়তা ইত্যাদি উদ্যোগ সামাজিক ন্যায়বিচারের রাস্তাকে প্রশস্ত করেছে। তা বহু ক্ষেত্রেই প্রান্তিক মানুষের মর্যাদারক্ষার সহায় হয়ে উঠেছে।

কিন্তু, এ কথাও অনস্বীকার্য যে, নামের উপরে মানুষের ব্যক্তিগত, এবং শিশুর ক্ষেত্রে পরিবারের অধিকার চূড়ান্ত; এই পরিসরে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ নিতান্ত অনধিকারচর্চা। ব্যক্তিনাম এক নামবাচক বিশেষ্য পদ— নাম এবং পদবির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। পদবি বৃহত্তর এক সামাজিক কাঠামোরই অংশ, কিন্তু ব্যক্তিনাম নাগরিকের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। ‘গিন্নি’ গল্পে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “নামপ্রিয় মানবের নাম বিকৃত করিয়া দিলে তাহার প্রাণের চেয়ে প্রিয়তর স্থানে আঘাত করা হয়। এমন-কি, যাহার নাম ভূতনাথ তাহাকে নলিনীকান্ত বলিলে তাহার অসহ্য বোধ হয়।” কথাটি বাস্তবিকই সত্য। নাম বস্তুটি মানুষের ব্যক্তিগত পরিচয়ের একেবারে কেন্দ্রে অবস্থান করে। এমনকি, শিশুদেরও। রাষ্ট্রের পছন্দ হচ্ছে না, এই দোহাই দিয়ে কারও নাম পাল্টে দিতে চাইলে তা সেই পরিচিতির কেন্দ্রটিকে এলোমেলো করে দিতে পারে। ব্যক্তিস্বাধীনতার এমন গভীর ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করার মতো গুরুতর কারণ রাষ্ট্রের কাছে আছে কি?

সন্দেহ হয়, নামগুলি রাষ্ট্রদেবতাদের পছন্দসই নয়, এর বাইরে নাম পরিবর্তনের আর একটিই কারণ থাকতে পারে— রাষ্ট্র-অনুমোদিত তালিকায় থাকা নামগুলির মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মের অনুরণন এমনই প্রবল যে, তাকে নিতান্ত সমাপতন বলে উড়িয়ে দেওয়া মুশকিল। ইদানীং ভারতীয় গণতন্ত্র যে অতলে পৌঁছেছে, তাতে আশঙ্কা হয় যে, ব্যক্তিস্বাধীনতার এই পরিসরটিকেও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাষ্ট্র দখল করে নেবে কার্যত বিনা বাধায়। ‘এক দেশ, এক নাম’ নামক অলিখিত নীতিটি যদি অতঃপর রাজস্থানের ভৌগোলিক গণ্ডি অতিক্রম করে অন্য রাজ্যে পৌঁছয়, এই বিকশিত ভারতে তা নিয়ে বিস্ময়ের খুব বেশি অবকাশ থাকবে না।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Government Schools Private Schools

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy