E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

গণতন্ত্রে বুলডোজ়ার

নির্বাচন কমিশন— ভারতীয় সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে উঠেছিল। নরেন্দ্র মোদী সরকারের দৌলতে আজ সেই কমিশন ক্ষমতার অপব্যবহারের এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ভারতীয় গণতন্ত্রকে বিশ্বের কাছে কালিমালিপ্ত করল।

শেষ আপডেট: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৬:২৭

গত নির্বাচনের আগে যে ভাবে এসআইআর পশ্চিমবঙ্গে সাধিত হয়েছিল, তা নিয়ে বহু আপত্তি ওঠে, প্রক্রিয়াগত ত্রুটির দিকে নির্বাচন কমিশন তথা কেন্দ্রীয় সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করা হয়। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে লাগাতার এসআইআর প্রক্রিয়ার অগণতান্ত্রিকতার বিষয়ে আলোকপাত করা হয়। লাভ হয়নি, কেননা নির্বাচন কমিশন প্রায় স্বৈরক্ষমতায় প্রক্রিয়া চালিয়ে গিয়েছে, এবং বহু মানুষের ভোটাধিকার অগ্রাহ্য করে বিধানসভা নির্বাচন সংঘটন করেছে। কিছুতেই স্বীকার করেনি গণতন্ত্রের একটি মৌলিক নৈতিক শর্ত যে— ভোটার তালিকার সংশোধন জরুরি কাজ, কিন্তু ভোটের সময় এত লক্ষ ভোটারকে অন্যায় ভাবে বাদ না দেওয়া আরও অনেক বেশি জরুরি কাজ। পশ্চিমবঙ্গের মতো ব্যাপক ভাবে না হলেও অন্য রাজ্যেও এ নিয়ে বহুবিধ প্রশ্ন উঠেছে। তবে ক্রমশই বিষয়টি চাপা পড়ে গিয়েছে। ভারতের বর্তমান নিষ্করুণ রাজনীতি চর্চার ধরন মেনে এসআইআর-অনৈতিকতার বিষয়টিরও পরোক্ষ স্বীকৃতি ও স্বাভাবিকীকরণ ঘটেছে। ইতিমধ্যে ২৩ সেপ্টেম্বর একটি সর্বভারতীয় দৈনিক দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সমস্ত হিসাব পাল্টে দিল। নির্বাচন কমিশনের ভিতরে এক নজিরবিহীন প্রশাসনিক ধস উন্মোচিত হল। জানা গেল, তিন সদস্যের কমিশনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের একচ্ছত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিরুদ্ধে অন্য দুই কমিশনার— সুখবীর সিংহ সান্ধু এবং বিবেক জোশী— গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন, ক্যাবিনেট সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ জানাতে বাধ্য হয়েছেন। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন শুধু বাইরে থেকে গণতন্ত্রের উপর বুলডোজ়ার চালায়নি, ভিতর থেকেও চালিয়েছে।

নির্বাচন কমিশন— ভারতীয় সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে উঠেছিল। নরেন্দ্র মোদী সরকারের দৌলতে আজ সেই কমিশন ক্ষমতার অপব্যবহারের এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ভারতীয় গণতন্ত্রকে বিশ্বের কাছে কালিমালিপ্ত করল। জানা গিয়েছে, নতুন ভোটার নিবন্ধনের ফর্ম ৬ পরিবর্তনের মতো সিদ্ধান্ত ১৯৬০ সালের বিধি সংশোধন না করেই জোরপূর্বক চালু করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার করে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার মূল ভিত্তিটি নষ্ট করা হয়েছে। ইআরও-দের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়ে কেন্দ্রীয় দফতর থেকে সফটওয়্যারের মাধ্যমে পুরো নিয়ন্ত্রণ কুক্ষিগত করে সারা দেশে প্রায় ১৩ কোটি নাম ভোটার তালিকা থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বিষয়টি ট্রাইব্যুনাল পর্যন্ত গড়ানোর পর, বিস্ময়কর ভাবে স্বয়ং কমিশনই সেই ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে নাগরিকদের ভোটাধিকার খর্ব করতে চেয়েছে। পিতামাতা বা পিতামহের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় থাকার আইনি ভিত্তিহীন ও বিতর্কিত শর্ত জুড়ে দিয়ে লক্ষ লক্ষ তরুণ নাগরিককে সরাসরি ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের মতো সংস্থা যখন বিশেষ রাজনৈতিক স্বার্থে বা অদৃশ্য ক্ষমতার নির্দেশে পরিচালিত হয়, তখন তা কেবল একটি নির্বাচনকে নয়, গোটা দেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রকে চরম বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার এই সামগ্রিক বিকৃতি এবং কোটি কোটি সাধারণ মানুষের আস্থাভঙ্গের পর বর্তমান ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত যে কোনও প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠে গেছে। এই সাংবিধানিক সঙ্কট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হল নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এই কারচুপির স্বরূপ সামনে আনা, বিতর্কিত এসআইআর প্রক্রিয়া অবিলম্বে স্থগিত করা, এবং বৈধ ভোটারদের নাম তালিকায় ফিরিয়ে আনা। কিন্তু যে ধরনের নিরপেক্ষ তদন্তে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায় প্রমাণ, এবং নির্বাচন কমিশনের রাজনৈতিক প্রভাব দূরীকরণের প্রয়াস সম্ভব, এই ভারতে তা আর অবশিষ্ট আছে কি?

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Gyanesh Kumar Election Commission of India Special Intensive Revision Indian Democracy

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy