বিশ্ব জুড়ে পর্যবেক্ষণাধীন বন্যপ্রাণীর সংখ্যা গড়ে ৭৩ শতাংশ কমেছে। অথচ ভারতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণীর সংখ্যা বেড়েছে— এই মর্মে গৌরবের প্রদর্শনী চলছে। এমন সময়ই ঐতিহাসিক আখ্যায় ভূষিত চিতা প্রত্যাবর্তন প্রকল্পের আওতায় থাকা আবারও একটি চিতাশাবকের মৃত্যুর খবরে প্রশ্ন ফিরল, উজ্জ্বল এই ছবির আড়ালে বাস্তবটা ঠিক কেমন। অবশ্যই উদ্বেগজনক, কারণ চলতি বছরে এই নিয়ে মোট সাতটি চিতার মৃত্যু হল, মোট চিতাসংখ্যা নামল ৫৯-এ। তবে, প্রকল্পটিকে ব্যর্থ বলা যাবে না, কারণ, আন্তর্মহাদেশীয় স্থানান্তরের ক্ষেত্রে প্রথম প্রজন্মের বন্যপ্রাণের সুস্থতা ও পরমায়ুর উপর রোগ, চোট-আঘাত, খাদ্যের জোগান, আবাসস্থলের জলবায়ু এবং অন্য শিকারি প্রাণীর সঙ্গে সংঘাত— অনেক কিছুরই প্রভাব বেশি পড়তে দেখা যায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে শাবকদের বেঁচে থাকার হারও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ টিকে থাকলে তবেই প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে প্রজাতির সংখ্যাবৃদ্ধিতে সমর্থ হবে। তাই মৃত্যুর কারণ কী, পরবর্তী ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা করা হচ্ছে— জানা জরুরি। অথচ একটি পশুর মৃত্যুর পর ময়না তদন্তের তথ্য জানতে চাওয়া হলে জাতীয় নিরাপত্তার অদ্ভুত যুক্তিতে তা আটকে দেওয়ার ঘটনা প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়েই সংশয় বাড়িয়েছে।
এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য শুধু আফ্রিকা থেকে চিতা এনে ভারতীয় জঙ্গলে রাখাই নয়, নতুন পরিবেশকে তাদের দীর্ঘমেয়াদি বাসস্থান হিসাবে উপযোগী করে তোলাও। ভারতের জঙ্গলে সেই পরিবেশ আদৌ প্রস্তুত করা গিয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন প্রকল্পটির সঙ্গে বরাবরই জড়িত। দক্ষিণ আফ্রিকার চিতা-বিশেষজ্ঞরা প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা, প্রাণীদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্যের আদানপ্রদান এবং পশুচিকিৎসার মান নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। সেই পুরনো অভিযোগকে কোনও নির্দিষ্ট মৃত্যুর কারণ বলে ধরে নেওয়া চলে না। কিন্তু বোঝা যায়, সংশয় অমূলক নয়। চিতার বেঁচে থাকার জন্য শুধু অনুকূল আবহাওয়া বা পর্যাপ্ত শিকারই যথেষ্ট নয়, পাশাপাশি নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা, শাবক ও মায়ের উপর নজরদারি এবং উন্নত পশুচিকিৎসার ব্যবস্থাও অত্যাবশ্যক। বিশেষ প্রণিধানযোগ্য, কুনোর ৫৩টি চিতার মধ্যে ৪০টির জন্ম ভারতে ঠিকই, তবে মাত্র ১৫টি চিতা বর্তমানে জঙ্গলের মুক্ত পরিবেশে ঘুরছে; বাকিরা আছে ঘেরাটোপ বা বন্য পরিবেশের প্রস্তুতিমূলক আবদ্ধ এলাকায়। এ দেশে জন্মানো শাবকের সংখ্যা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক, কিন্তু বিশেষ করে চিতার মতো প্রাণীর ক্ষেত্রে জন্ম মানেই বন্য পরিবেশে স্থায়ী ভাবে টিকে যাওয়া নয়। এবং, ঘেরাটোপের মধ্যে শাবক জন্মের হিসাব দেখিয়ে প্রকল্পের অগ্রগতি জাহিরও উচিত নয়; কারণ, সেটিকে প্রকৃত বন্য পশুসংখ্যা বৃদ্ধির হিসাবে ধরা চলে না।
এই সব লক্ষণের কারণেই আশার শাবকটির ময়না তদন্তের রিপোর্ট প্রকাশে অনীহা অস্বস্তিকর ঠেকে। অবশ্যই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির কিছু তথ্য গোপন রাখার যুক্তি থাকতে পারে। কিন্তু তার সারাংশ প্রকাশের প্রয়োজনকে অগ্রাহ্য করা যায় না। মৃত্যুর কারণ জানলে সর্বস্তরেই ঝুঁকি কমানো নিয়ে আলোচনা ও উপযুক্ত বন্দোবস্ত গ্রহণ করা যায়। চিতা প্রত্যাবর্তন কিন্তু নিছক ব্যক্তিগত প্রচার-অভিযান মাত্র নয়, তার পরিবেশগত তাৎপর্য বিরাট। যে জঙ্গলে বড় শিকারি প্রাণী নেই, সেখানে চিতা ফিরলে জঙ্গলটির আকর্ষণই বাড়বে না, সুস্থ থাকবে বন-বাস্তুতন্ত্রও।