E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

কেন এত তাড়া

ভোটার তালিকা সংশোধন, কিংবা ওয়র্ড পুনর্বিন্যাসের মতো প্রশাসনিক কাজ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য দ্বারা চালিত হচ্ছে, এই ভয়ানক সম্ভাবনাকে জনমানসে ‘স্বাভাবিক’ হয়ে উঠতে দেওয়া চলে না।

শেষ আপডেট: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৪:৫৪

কলকাতা এবং হাওড়া পুরসভায় ওয়র্ড পুনর্বিন্যাসের বিল পাশ হল, কিন্তু অনেকগুলি প্রশ্ন রয়েই গেল। প্রথম প্রশ্ন, এত তাড়া কিসের? নভেম্বরে পুরসভাগুলিতে নির্বাচনের ঠিক আগে ওয়র্ড পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন কী? রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে বৈঠক, এলাকার মানুষদের নিয়ে জনশুনানি, ওয়র্ডগুলির পরিকাঠামো, পরিষেবা এবং জনসুবিধাগুলির অবস্থান মাথায় রেখে বিস্তারিত মানচিত্র প্রস্তুত করা— এই বিপুল ও জটিল কাজ কয়েক মাসের মধ্যে করা সম্ভব নয়, উচিতও নয়। অতএব দ্বিতীয় প্রশ্ন, পুনর্বিন্যাসের উদ্দেশ্য কি উন্নত পরিষেবা দান, না কি নির্বাচনে শাসক দলের সুবিধা করা? এ প্রশ্ন শুধু বিরোধীদের নয়, নাগরিকেরও। এই পুনর্বিন্যাসের নীতি কী, পুনর্বিন্যাসের ভিত্তি ভোটার সংখ্যা না কি জনসংখ্যা, ওয়র্ডগুলিতে বর্তমানে জনসংখ্যা কত, তা জানার আগেই ওয়র্ড বিভাজন নিয়ে সর্বদলীয় বৈঠক শুরু হয়ে গিয়েছে। কংগ্রেস এবং সিপিএমের তরফে যেমন পুর কমিশনারের কাছে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, প্রতি ওয়র্ডে কম-বেশি ১৬ হাজার ভোটার রাখার কথা বললেও খসড়ায় বত্রিশটির বেশি ওয়র্ডে ১৩,৫০০-র কম, আবার কয়েকটি ওয়র্ডে ৩০ হাজারের বেশি ভোটারও রাখা হয়েছে কেন? কেনই বা কোনও ওয়র্ডের জনঘনত্ব প্রকাশ করা হয়নি? কংগ্রসের পক্ষ থেকে এই প্রশ্নও উঠেছে যে, ভোটার তালিকার ভিত্তিতে না হয়ে যদি জনসংখ্যার ভিত্তিতে পুনর্বিন্যাস হয়, তা হলে কেন ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে তা করা হচ্ছে, যখন দেশে জনগণনা চলছে? সিপিএমের তরফেও দাবি করা হয়েছে, জনগণনা শেষ হলে তবেই ওয়র্ডের পুনর্বিন্যাস হোক। কেন জনগণনা হওয়ার আগে, বা ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ওয়র্ড বিভাজন হচ্ছে, সে বিষয়ে পুর-প্রশাসক এবং রাজ্য সরকার নীরব।

স্বভাবতই সংশয় গাঢ় হচ্ছে যে নির্বাচনের মুখে ওয়র্ড পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে শাসক দলের রাজনৈতিক সুবিধার জন্য। বিরোধীদের সমর্থন যে ওয়র্ডগুলিতে বেশি, আসন্ন পুরনির্বাচনের কথা ভেবে সেগুলোর বিভাজন করে ভোট ভাগ করাই এই প্রক্রিয়ার প্রধান উদ্দেশ্য। পশ্চিমবঙ্গ পুর-নিগম আইনের ৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী ওয়র্ডের সংখ্যা নির্দিষ্ট করার ক্ষমতা রয়েছে রাজ্য সরকারের হাতে। ওয়র্ড পুনর্বিন্যাস করা রাজ্য নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। আক্ষেপ, নির্বাচন কমিশনের স্বাতন্ত্র্য এখন প্রশ্নের মুখে। সংবাদে প্রকাশ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কাজ করতে গিয়ে কমিশন এমন কিছু পদক্ষেপ করেছে যা আইনত অবৈধ, নাগরিক অধিকারের বিরোধী। বিহার, পশ্চিমবঙ্গ-সহ নানা রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল যে অনেকখানিই প্রভাবিত করেছে সংশোধিত ভোটার তালিকা, সে সম্ভাবনা এখন বিপুল ভাবে আলোচিত হচ্ছে। কলকাতা-সহ পশ্চিমবঙ্গের পুরসভাগুলিতে ওয়র্ড পুনর্বিন্যাসের সময়ে এই প্রেক্ষিতটি মাথায় রাখা একান্ত প্রয়োজন।

ভোটার তালিকা সংশোধন, কিংবা ওয়র্ড পুনর্বিন্যাসের মতো প্রশাসনিক কাজ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য দ্বারা চালিত হচ্ছে, এই ভয়ানক সম্ভাবনাকে জনমানসে ‘স্বাভাবিক’ হয়ে উঠতে দেওয়া চলে না। বিশেষ করে কোনও বিশেষ ধর্ম বা সম্প্রদায়ের মানুষের বসত-এলাকাকে পুনর্বিন্যাসের লক্ষ্য করা হলে তা হবে অনৈতিক, প্রতিবাদের যোগ্য। পুরসভাগুলিতে ওয়র্ড পুনর্বিন্যাসের নকশা সব রাজনৈতিক দল এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে যুক্তিগ্রাহ্য এবং অনুকূল বলে প্রতিপন্ন না হওয়া পর্যন্ত আলোচনা চালানো দরকার। পুরসভার প্রধান কাজ পরিষেবা প্রদান। কাউন্সিলরের অফিস, পুরসভার স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রভৃতির নাগাল পাওয়া সহজ হতে হবে। প্রধান কিছু জনপরিষেবা থেকে ওয়র্ডের বিভিন্ন প্রান্তের নাগরিকের দূরত্ব কতখানি, তারও পরিমাপ দরকার। নির্বাচনের তারিখ এই বহুস্তরীয় কাজের সীমা নির্ধারণ করতে পারে না। ওয়র্ডের নতুন বিন্যাস নির্বাচনের পরে হওয়াই বাঞ্ছনীয় ছিল।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Wards SIR

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy