হাবড়ায় শিশুকন্যার মৃত্যুর ঘটনাটি আবার জানিয়ে দিল যে, সর্পদংশনের ফলে জীবনহানিতে ভারত যে বিশ্বে শীর্ষে স্থানে রয়েছে, তার মূল কারণ অসচেতনতা। সাপের কামড়ে এখানে যত মানুষ মারা যান, অন্য সব বন্যপ্রাণীর আক্রমণ মিলিয়েও তত মৃত্যু হয় না। এর প্রত্যক্ষ কারণ সর্পদংশন নয়, বরং সাপে কাটার চিকিৎসা সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং কুসংস্কার। দেখা গিয়েছে, বহু সাপই নির্বিষ, আবার কিছু সাপ ‘ড্রাই বাইট’-এ বিষ ঢালে না। ফলত রোগী স্বাভাবিক নিয়মেই সুস্থ হয়ে উঠলেও, ওঝা এটি তাঁর ‘অলৌকিক ক্ষমতা’ বলে দাবি করলে গ্রামীণ সমাজে অন্ধবিশ্বাসের জমি পোক্ত হয়। কিন্তু যখন চন্দ্রবোড়া, কালাচ প্রভৃতি ভয়ানক বিষধর সাপ কামড় দেয়, তখন এই বিশ্বাসের কড়া মাসুল দিতে হয়। ওঝার কাছে গিয়ে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়, অথচ শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলি দ্রুত বিকল হতে থাকে, মৃত্যু ত্বরান্বিত হয়— ঠিক যেমনটি শিশুটির ক্ষেত্রে হয়েছে।
কাজেই, সচেতনতা বৃদ্ধির কোনও বিকল্প নেই। মানুষকে জানাতে হবে, সময়মতো হাসপাতালে গেলে তবেই সাপের বিষের প্রভাব কাটানো সম্ভব। সাপের কামড় একটি চিকিৎসাগত জটিল ও জরুরি অবস্থা। অতি দ্রুত কিছু বিষ-প্রতিরোধী ইনজেকশন দিতে হয়, শ্বাসযন্ত্র পক্ষাঘাতগ্রস্ত হলে ভেন্টিলেটর, কিডনির ক্ষতির ক্ষেত্রে ডায়ালিসিস প্রয়োজন হয়। এই জীবনদায়ী ওষুধ ও যন্ত্রগুলি স্বভাবতই কোনও গুনিন, ওঝার কাছে থাকে না। অতএব, সতর্কতামূলক প্রচারের পাশাপাশি এই ভুয়ো চিকিৎসার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা এবং হাসপাতালগুলিতে তো বটেই, ব্লক পর্যায়ের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে সর্বদা পর্যাপ্ত জীবনদায়ী ওষুধ মজুতের নিশ্চয়তা, চিকিৎসাকর্মীদের পরিস্থিতি সামলানোর প্রশিক্ষণ জরুরি। সাপের কামড়ের ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত কতটা গুরুত্বপূর্ণ তার প্রমাণ মিলেছিল অগস্টের কলকাতা শহরে। ভবানীপুরের স্কুলে ছাত্রের হাতে যে সাপটি কামড়েছিল তাকে প্রাথমিক ভাবে বিষধর হিসাবে সন্দেহ করলেও সঙ্কট যে ঘনায়নি, তার কারণ রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা শুরু করা হয়েছিল।
শুধু গ্রামাঞ্চল, বা মফস্সল, ছোট শহর নয়, এ বার খাস কলকাতায় বর্ষায় বারে বারে সাপের দেখা পাওয়ার ঘটনাতেও উদ্বেগ সঞ্চারিত হয়েছে। অতএব, সতর্কতা প্রয়োজন নগরাঞ্চলেও। স্পষ্ট যে, বর্ষাকালে মানুষ ও সাপের সাক্ষাতের সম্ভাবনা বাড়ে, অভিঘাত দেখা দেয় এমন জায়গায় যেখানে শিশুর নিরাপদ থাকা বাঞ্ছনীয়। এর পরিবেশগত ব্যাখ্যা হল, একদা যেখানে জলাভূমি, নিচু জমি, খাল-পুকুর, ঝোপঝাড় ছিল, সেখানে নির্মাণের চাপ ক্রমবর্ধমান। শহরের নিকাশির সঙ্গে প্রাকৃতিক জলপথের সংযোগ রয়েছে। ফলে জল বাড়লে সেই পথে সাপের মানুষের কাছাকাছি আসার সম্ভাবনা রয়েছে। অতএব, স্কুলগুলির নিয়মিত সাফাইয়ের পাশাপাশি সমীক্ষা প্রয়োজন— কোথায় ইঁদুর বেশি, দরজায় কোথায় ফোঁকর, কোনও ঘর পরিত্যক্ত বা আবর্জনাপূর্ণ কি না। পাশাপাশি, বিদ্যালয়গুলিতে সচেতনতামূলক কার্যক্রমে ছাত্র, শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের জানানো প্রয়োজন সাপ দেখলে কী কী করণীয়। আতঙ্ক নয়, সাপ-সম্পর্কিত সম্যক জ্ঞানার্জনই প্রকৃত নিরাপত্তাবিধি। পাশাপাশি, মৃত্যুহার কমাতে স্ট্রোক বা হৃদ্রোগ সামলানোর মতোই সাপের কামড়কে সমান গুরুত্ব দিয়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রস্তুত রাখতে হবে।