E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

আচার্যের দান

ছোটবেলা থেকে বড় হয়ে ওঠার পথে মা-বাবার পরেই শিক্ষকদের সঙ্গে-সান্নিধ্যে অনেকটা সময় কাটায় প্রতিটি মানবক, মা-বাবার মতোই তাঁরাও হয়ে ওঠেন আদর্শপ্রতিম, আজকের ভাষায় ‘আইকন’ বা ‘আইডল’, সেই শ্রদ্ধা-সমীহ-সম্ভ্রম-ভালবাসাই কি আজীবন থেকে যায়?

শেষ আপডেট: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৫:৪৫

আর একটি শিক্ষক দিবস চলে গেল। প্রত্যাশিত ভাবেই, বিপুলসংখ্যক মানুষ শ্রদ্ধা জানালেন তাঁদের ছোটবেলার কিংবা বড় হয়ে ওঠার পথে নানান প্রাতিষ্ঠানিক স্তরের শিক্ষকদের— যাঁরা নেই, যাঁরা আজও আছেন: সকলকেই। চার পাশের সমাজ-রাজনৈতিক বাস্তবতা নানান দুর্বিপাকে গ্রস্ত, সু-রুচি ও চিন্তার দুর্ভিক্ষে পীড়িত, সেই পরিস্থিতিতেও সাধারণ্যের নিখাদ স্মরণ-শ্রদ্ধা প্রমাণ করে, এই একটি পেশাজীবীকে মানুষ এখনও জীবিকার ঊর্ধ্বে, জীবনবোধের গুরুত্বে মাপেন। শিক্ষক সমাজের সেবক, তবে এমন সেবক তো আরও কতই আছেন— চিকিৎসক, জরুরি পরিষেবার কর্মী, মানুষের অধিকারের দাবি নিয়ে পথে নামা সমাজকর্মী, মানুষের হয়ে লেখা সাংবাদিক। কিন্তু শিক্ষক বলতে যে স্বপ্রকাশ আলোর কথা মনে হয় তা এঁদেরও নেই। বহু পেশাজীবী মানুষই সৎ, আন্তরিক ভাবে আজীবন কাজ করে যান এ কথা এ যুগেও সত্য, কিন্তু ব্যক্তি ও সমষ্টি-মানুষের অন্তর থেকে উঠে আসা প্রণতি শিক্ষকেরা যেমন পান, তার জুড়ি আর কোথায়?

এই শ্রদ্ধাবোধের কারণ কী? ছোটবেলা থেকে বড় হয়ে ওঠার পথে মা-বাবার পরেই শিক্ষকদের সঙ্গে-সান্নিধ্যে অনেকটা সময় কাটায় প্রতিটি মানবক, মা-বাবার মতোই তাঁরাও হয়ে ওঠেন আদর্শপ্রতিম, আজকের ভাষায় ‘আইকন’ বা ‘আইডল’, সেই শ্রদ্ধা-সমীহ-সম্ভ্রম-ভালবাসাই কি আজীবন থেকে যায়? শিক্ষক দিবসের অনুষঙ্গে সেই কৃতজ্ঞতাই কি ফিরে ফিরে আসে আপ্লুত অঞ্জলিতে? সমাজ-মনস্তত্ত্বের বিশেষজ্ঞরা বলবেন, এ একটি কারণ নিশ্চয়ই। আধুনিক জীবন ও সভ্যতা মানুষকে যতই যন্ত্র ও বস্তু-অভিমুখী করুক না কেন, চেতনার গভীরে মানুষ এক আবেগী সত্তা, ‘ইমোশনাল বিয়িং’— এবং ভালবাসার মতো মৌলিক অনুভূতির অভিজ্ঞতা তার চেতনা থেকে কখনও মুছে যায় না। জীবনে তথা সমাজে যাঁদের কাছ থেকে আমরা নিখাদ ভালবাসা পাই, তাঁরা হয়ে ওঠেন আমাদের অন্তরতম— তিনি হতে পারেন মা বা বাবা, অভিভাবক, প্রতিবেশী কিংবা বন্ধুও, এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই— শিক্ষক। শিক্ষককে আজীবন শ্রদ্ধার আরও এক কারণ নিশ্চিত ভাবেই তাঁর শিক্ষাদান; বিশ্বসংসারের যে সসীম বস্তু এবং অসীম বোধগুলি আমাদের আয়ত্ত ছিল না, শিক্ষকেরা তা হাতে, কলমে এবং মনে ধরিয়ে দেন। প্রথম যিনি অক্ষরপরিচয় করান, পরিচয় করিয়ে দেন প্রকৃতির রহস্যের সঙ্গে, লাইব্রেরিতে হাতে তুলে দেন জীবন বদলে-দেওয়া বই; খেলার মাঠে, আবৃত্তি বা নাচের প্রতিযোগিতার মঞ্চে, রেসের ট্র্যাকে, সাঁতারের পুলে ক্রমাগত আশ্বস্ত বা উদ্বুদ্ধ করে চলেন সামনে, পাশে কিংবা দূরে থেকেও— সেই শতসহস্র ‘প্রথম’-এর কারিগরদের প্রতি আমাদের স্মৃতি ও সত্তা জীবনভর চিরপ্রণাম রেখে যায়।

শিক্ষাদান পেশা যাঁদের তাঁরা সকলেই শিক্ষক বটে, তা বলে তাঁদের সবার কাছে ভালবাসায় কৃতজ্ঞতায় ফেরে না মানুষ। ফেরে তাঁদের কাছেই, বইয়ের পাতা ছাড়িয়ে শিক্ষাকে জীবনে চারিয়ে দিতে পেরেছেন যাঁরা, হয়ে উঠেছেন মূল্যবোধের মূর্তি। অধীত বিষয় বা জ্ঞানচর্চার পরিসরে যাঁরা দৃষ্টান্তস্বরূপ তাঁরা তো রইলেনই, ছাত্রেরা তারও বেশি মনে রাখে মাস্টারমশাইদের মানবিক মুখ। প্রযুক্তিতাড়িত এই সময়ে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক বদলে যাওয়া নিয়ে নানা কথা উঠছে, অদূর ভবিষ্যতে মানুষ-শিক্ষক থাকবেন কি না, উঠছে সেই প্রশ্নও। আবার প্রযুক্তির ফেরেই ধরা পড়ছে বহু শিক্ষকের নানান অ-শিক্ষকসুলভ আচরণ ও কাজ। শিক্ষকের ‘ছাত্র শাসন’ নিয়ে তর্কটি আজকের নয়। দেখা যাচ্ছে, নবযুগের বিবর্তিত সামাজিক মূল্যবোধে ছাত্র শাসনের বাহ্যিক রূপটি পাল্টেছে, অন্য দিকে বিশেষত প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার পরিসরে শিক্ষকদের দ্বারা ‘ছাত্র শোষণ’-এর প্রবণতাও কিছু কম নয়। ভারতের সমাজে শিক্ষকদের আসনটি এতই উচ্চে পাতা যে, শিক্ষাক্ষেত্রে প্রদীপের তলার অন্ধকার নিয়ে কথা বলতে গেলে সমাজপতিরা চুপ করিয়ে ছাড়েন, সাধারণ মানুষও ভোগেন অস্বস্তিতে। শিক্ষকের অত্যুচ্চ বিগ্রহ নির্মাণপ্রক্রিয়ায় পদস্খলনের স্থান নেই, সমাজ ও রাষ্ট্র তাঁর স্খলনের সম্ভাব্যতাকে পর্যন্ত অস্বীকার করে। এরই সুযোগ নিয়ে অনেক অনধিকারী শিক্ষকও পেয়ে চলেন সম্মানের ডালা। চাঁদেও কলঙ্ক আছে, কিংবা চালেও কাঁকর— এই নির্ণয়মতে হয়তো ছাত্রসমাজ তাঁদের সহ্য করে নেয়। তবে মূলসত্যটির গায়ে তাতে আঁচড় পড়ে না, যা ধরা আছে মহাভারতে উদ্যোগপর্বের এই শ্লোকে: “শরীরমতৌ কুরুতঃ পিতা মাতা চ ভারত।/ আচার্যশাস্তা যা জাতিঃ সা পুণ্যা সাঽজরাঽমরা।” পিতামাতা দেন শরীর, আচার্যের দান অক্ষয় ভাবশরীর।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Teachers' Day Teachers Students Education system

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy