E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

প্রজন্মান্তর

বিপুল নাগরিক জয় রেখে গেল ভারতের রাজনৈতিক সমাজের জন্য কতকগুলি প্রত্যক্ষ বার্তা। প্রথম বার্তাটিই প্রতিবাদেচ্ছুক জনসমাজের জন্য।

শেষ আপডেট: ২৮ জুলাই ২০২৬ ০৬:৪৬

জেন-জ়ি’দের জয়, জেন-জিদের জয়: সংবাদ শিরোনাম অতি যথার্থ। নাগরিক আন্দোলনের এত বড় জয়, এত সার্থক জেদ অনেক দিন দেখেনি ভারতবর্ষ। গত বারো বছরের বিজেপি শাসনকালে সরকারকে প্রশাসনিক স্খলনের প্রশ্নে এ ভাবে পিছু হটতে দেখা যায়নি। দেশব্যাপী ‘ককরোচ’ অভিধাধারী অল্পবয়সি তরুণতরুণীর যৌবনজলতরঙ্গ উচ্ছলিত হয়ে উঠল শাসকের সামনে। নির্মম পুলিশি অত্যাচারের সামনেও বুক চিতিয়ে লড়াই করার সাহস ও দম দেখিয়ে তারা জয় আদায় করে নিল। এই আন্দোলনের প্রধান হেতু ছিল পরীক্ষা-দুর্নীতির প্রতিবাদ, প্রধান দাবি ছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। সেই দাবি পূর্ণ হয়েছে— বড় সুসংবাদ— কেননা, নিট ও অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস ও অন্যান্য দুর্নীতির পিছনে মন্ত্রী নিজে সরাসরি দায়ী হোন বা না হোন, এত বছরের লাগাতার অন্যায় ও এতগুলি ছাত্রছাত্রীর আত্মহননের দায় কাউকে নিতেই হত, সেটাই গণতন্ত্র-মতে সমীচীন। ধর্মেন্দ্র প্রধানের অপসারণ ছাড়াও কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে আশ্বাস— পরীক্ষা-দুর্নীতির মূলোৎপাটনের চেষ্টা করা হবে। আশ্বাসে ভরসা রাখা ছাড়া আপাতত গত্যন্তর নেই। যদিও ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা ও পরীক্ষাব্যবস্থার রোগ এত গভীর ও ব্যাপ্ত যে সরকারের বিভিন্ন মহলের যৌথ সুসংহত প্রয়াস ছাড়া কোনও নিরাময় অসম্ভব। নতুন মন্ত্রী প্রহ্লাদ জোশীর নেতৃত্বে তা কত দূর সম্ভব হয়, নজর রাখবে দেশ, বিশেষত দেশের যুবসমাজ।

তবে এই বিপুল নাগরিক জয় রেখে গেল ভারতের রাজনৈতিক সমাজের জন্য কতকগুলি প্রত্যক্ষ বার্তা। প্রথম বার্তাটিই প্রতিবাদেচ্ছুক জনসমাজের জন্য। বারো বছর ধরে যে ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী মত নিষ্পেষণের উত্তুঙ্গ অভিযোগ, তার বিরোধিতার একটি নতুন পথ তৈরি হল এই আন্দোলনে। পুরনো ধাঁচের রাজনৈতিক আদর্শ, উদ্দেশ্য, বিধেয়কে অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়ে কেবল চোখে চোখ রেখে লড়াইয়ের মানসশক্তি দিয়ে চালিয়ে যাওয়া এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন কেবল ভারতে নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার পরিপ্রেক্ষিতেই প্রতিরোধের নতুন জেন-জ়ি মডেল। ইতিপূর্বে বাংলাদেশে বা নেপালের জেন-জ়ি বিদ্রোহ ছিল অনেক বেশি হিংসাত্মক, ধ্বংসাত্মক। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, ভারতে আন্দোলনের মধ্যে হিংসা বা ধ্বংসতাণ্ডব ছিল প্রায় অনুপস্থিত, কিছু বিক্ষিপ্ত ঘটনা ছাড়া। বরং রঙ্গরসিকতার কামড় ও বুদ্ধিদীপ্ত ব্যঙ্গের কশাঘাত ছিল তীব্র। এই দেশে এখন বিরোধী রাজনীতি নিত্যদিন অর্থমূল্যে কেনাবেচার সামগ্রী, ইডি-সিবিআই’এর হুমকির সামনে অপরাধ-দুর্নীতি ঢাকতে পলায়নপর নেতাদের দ্বারা কলঙ্কিত। জেন-জ়ি প্রতিরোধ তাই এনে দিল এক ঝলক নতুন আলো।

শাসক দলের জন্যও রইল বার্তা। বর্তমান সরকার ভয় দেখিয়ে, প্রতিবাদীমাত্রকেই ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ বলে দাগিয়ে, তাদের অপরাধী হিসাবে বন্দি করে, সাম্প্রদায়িক বিভেদের আতঙ্ক ছড়িয়ে দেশ শাসন করে আসছে। ককরোচ জনতা পার্টি আন্দোলন স্পষ্ট করে দিল যে তাদের অভিভাবক প্রজন্মকে এই পথে কাবু করা গেলেও সন্ততি প্রজন্ম তা প্রতিহত করতে প্রস্তুত, বিভেদবিষকে পরিহার করতে উন্মুখ। স্পষ্ট হল, যে সমাজমাধ্যম ব্যবহারে এই বিভেদাত্মক রাজনীতি ছড়ানো গিয়েছে, সেই সমাজমাধ্যমের সহায়তাতেই তার প্রতিরোধী বয়ানটিও দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তে পারে। এও স্পষ্ট, দীর্ঘকালীন অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যর্থতা ও পশ্চাৎপদতা থেকে মনোযোগ ঘোরানোর চেষ্টায় শাসক এত কাল সফল হলেও নতুন প্রজন্ম কিন্তু আবারও শিক্ষা, কর্ম ও সুস্থ জীবনের দাবিতে ফিরতে উৎসুক। সুতরাং সিজেপি-র জয়কে রাহুল গান্ধী ও অন্য বিরোধীরা যতই ‘আপন’ করে নিতে চান না কেন, শেষ পর্যন্ত শাসকের মতো বিরোধীদেরও এই প্রজন্মের কাছে নিজেদের রাজনীতির যোগ্যতা আবার নতুন করে প্রমাণ করতে হবে।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
NEET Gen Z

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy