চিকিৎসার ক্ষেত্রে সব থেকে সৌভাগ্যবান ওড়িশার নাগরিক, কারণ সে রাজ্যে চিকিৎসার খাতে মোট খরচের অর্ধেকেরও বেশি (৫৩ শতাংশ) আসে রাজ্যের ভাঁড়ার থেকে। ২০২২-২৩ সালে নাগরিকের চিকিৎসার জন্য ওড়িশা সরকার মাথাপিছু খরচ করেছে ২৮২৪ টাকা, আর নিজেদের পকেট থেকে ওড়িশাবাসী খরচ করেছেন ২২৪৫ টাকা। অর্থাৎ নাগরিকের চিকিৎসার খরচের দায় সরকার বহন করেছে বেশি। সেখানে পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকের মাথাপিছু পকেট-খরচ (আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার) ৪১৮৩ টাকা, আর সরকারি খরচ ২০৯৮ টাকা। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের প্রতিবেদন ‘ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস এস্টিমেটস ২০২২-২৩’ বলছে, চিকিৎসার জন্য মোট ব্যয়ের মধ্যে নাগরিকের অংশ পশ্চিমবঙ্গে কর্নাটক, তামিলনাড়ু বা ওড়িশার চেয়ে বেশি। এমনকি মহারাষ্ট্র, ওই বছর চিকিৎসার জন্য মোট খরচের (সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে) নিরিখে যা ছিল ভারতে প্রথম স্থানে (এক লক্ষ কোটি টাকা), সেখানেও নাগরিকের পকেট-খরচ মোট খরচের ৪০ শতাংশ। অথচ, দ্বিতীয় স্থানে থাকা পশ্চিমবঙ্গে (৬৬ হাজার কোটি টাকা) নাগরিকের পকেট-খরচ মোট খরচের ৬২ শতাংশ। অথচ, ২০২২-২৩ সালে ‘স্বাস্থ্য সাথী’ বিমার জন্য পশ্চিমবঙ্গ খরচ করেছিল ২৫০০ কোটি টাকা। তা ছাড়াও ছিল হাসপাতালে ফ্রি চিকিৎসা, বিনামূল্যের ওষুধ, ইমপ্লান্ট, চিকিৎসার প্রয়োজনে বিনামূল্যে বিভিন্ন পরীক্ষার ব্যবস্থা। সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ওই বছর ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি খরচ করেছিল। তার পরেও কেন পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে নিজেদের পকেট থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হল? সরকারি হাসপাতালের শয্যা, বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যের ওষুধ, বিনামূল্যে পরীক্ষা, সরকারি ব্লাড ব্যাঙ্ক, অ্যাম্বুল্যান্স— এগুলি কি প্রয়োজনের তুলনায় কম পড়ছে, না কি থাকা সত্ত্বেও ব্যবহার হচ্ছে না?
ভুক্তভোগী রোগীরা বলবেন— সরকারি হাসপাতালেও রোগীর খরচ কম হয় না। রয়েছে দালাল চক্র, অকেজো ব্যবস্থা, ওষুধ বা পরীক্ষার রিপোর্টের মান নিয়ে সংশয়, দীর্ঘ বিলম্বের হতাশা। এ সবই রোগীর পরিজনকে ঠেলে দেয় পকেট থেকে খরচ করতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম, হাজার রোগীপিছু থাকবে তিনটি হাসপাতাল-শয্যা। পশ্চিমবঙ্গে সরকারি এবং বেসরকারি মিলিয়ে হাজার রোগীতে শয্যার অনুপাত ০.৯। সরকারি চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীদের বহু পদ শূন্য। গলদ সরকারি পরিকল্পনাতেও— তৃণমূল আমলে জেলার ‘সুপার স্পেশালিটি’ হাসপাতাল চেহারায় তাক লাগিয়েছে, কিন্তু কাজের বেলা উন্নত হাসপাতাল হয়ে ওঠেনি। প্রশিক্ষিত কর্মী, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে বহু দামি যন্ত্র নষ্ট হয়েছে। তার উপর রয়েছে দুর্নীতির চক্র, দায়বদ্ধতার অভাব। সরকারি হাসপাতালে প্রচুর রোগীর চাপ, এমন ধারণা ছড়িয়েছে, ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বহু রোগীকে, যদিও হাসপাতালের পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা। সংবাদে প্রকাশ, আউটডোরে ডাক্তারদের উপস্থিতি, সার্জন-পিছু অস্ত্রোপচারে অনেক রাজ্যের থেকে পিছিয়ে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ।
নতুন বিজেপি সরকার এসেছে, অতএব কেন্দ্রের সুলভ ওষুধের দোকান, স্বাস্থ্য বিমা প্রভৃতি প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গে বড় আকারে ছড়িয়ে দেওয়ার ঝোঁক দেখা যাবে। কিন্তু প্রধান প্রয়োজন সরকারি ব্যবস্থাপনার যথাযথ ব্যবহার। তার জন্য প্রতিটি স্তরের হাসপাতালে কর্মী-চিকিৎসকের উপস্থিতি, কাজের পরিমাপ, পরিষেবার মান, এগুলির নিয়মিত পরিদর্শন এবং মূল্যায়ন একান্ত জরুরি। আর প্রয়োজন দলীয় সংযম। আর জি কর-কাণ্ড দেখিয়েছে, শাসক দলের দুর্নীতি একটি হাসপাতাল ব্যবস্থার আগাপাছতলা পচন ধরাতে পারে। সরকারি হাসপাতালকে দলীয় প্রভাবমুক্ত, স্বচ্ছ এবং দায়বদ্ধ না করতে পারলে বাগাড়ম্বরই সার হবে। এক দিকে রাজস্বের অপচয়, অন্য দিকে চিকিৎসার পকেট-খরচে বৃদ্ধি, দু’দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন রাজ্যবাসী।