যে যে সুবিধা থাকলে একটি বড় শহরকে সত্যি বড় শহর বলা যায়, তার অন্যতম: গণপরিবহণ। কলকাতার মতো মহানগরে অনেক দিনের অভিযোগ, এখানে ব্যক্তিগত গাড়ি যে হারে বেড়েছে, গণপরিবহণ তত নয়— একটু রাত হলেই পথেঘাটে বাসের দেখা মেলে না, এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের জীবনরেখা মেট্রো রেলের পরিষেবাও ফুরিয়ে যায় ঢের আগে। এই প্রেক্ষিতে গত সোমবার থেকে ব্লু ও গ্রিন দুই পথেই মেট্রো পরিষেবার সময়সীমা বাড়ল, সুসংবাদ। সোম থেকে শনিবার সকাল ৬টা থেকেই পাওয়া যাবে মেট্রো, রাতে পাওয়া যাবে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত, অর্থাৎ ভোর থেকে প্রায় মধ্যরাতের কাছাকাছি মেট্রোয় যাতায়াতের সুবিধা পাবেন নাগরিকেরা, দীর্ঘ কর্মক্লান্তি শেষে দ্রুত গতিতে বাড়ি ফিরতে পারবেন; সকাল সকাল বা বেশি রাতের দিকে যাঁদের কাজ শুরু, তাঁদের খুব কাজে দেবে। এই সিদ্ধান্ত আপাতত পরীক্ষামূলক বলা হচ্ছে, কিন্তু এই ২০২৬ সালের বাস্তবে দাঁড়িয়ে অন্তত মধ্যরাত পর্যন্ত মেট্রো পরিষেবা কি খুব বেশি চাওয়া?
কলকাতা মেট্রোর ক্ষেত্রে ট্রেনের সময়সীমা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়— পরিষেবার নির্ভরযোগ্যতা ও যাত্রী-নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মেট্রোর সময় বাড়লেও টিকিট কাউন্টার রাত সাড়ে ৯টাতেই বন্ধ হয়ে যাবে বলে জানা গেছে। রাত সাড়ে ১০টায় মেট্রো ধরবেন যে যাত্রীরা, তাঁরা যদি কাউন্টার থেকে টিকিট কাটতে না পারেন, শুধু স্মার্ট কার্ড, টিকিট ভেন্ডিং মেশিন বা মেট্রো রেলের অ্যাপের উপরেই তাঁদের নির্ভর করতে হয়, তবে তা হবে সমান অসুবিধার— সব যাত্রীর এই বিকল্পগুলি জানা না-ও থাকতে পারে। ২০২৪ সালেও পরীক্ষামূলক ভাবে বেশি রাত পর্যন্ত মেট্রো চালু করার সময় এই সমস্যা হয়েছিল, এমনকি নিরাপত্তাজনিত কারণে তখন স্টেশনের সব গেটও খোলা থাকত না— সব মিলিয়ে রাতের পরিষেবা বিভ্রান্ত ও বিরক্ত যাত্রীদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছিল। এ বার মেট্রোর সময় বাড়িয়েও যদি একই কারণে তা সফল না হয়, কর্তৃপক্ষও কিছু দিন দেখে রাতের পরিষেবা ফের বন্ধ করে দেন, তবে তা হবে দুর্ভাগ্যের, প্রশ্ন উঠবে এই ‘পরীক্ষা’ নিয়েও।
আসল সত্য হল, কলকাতা মেট্রোর ট্র্যাফিক বিভাগে কর্মীর রীতিমতো সঙ্কট রয়েছে। নতুন মেট্রোপথ প্রসারিত হওয়ার পর বহু নতুন স্টেশন চালু হলেও সেই অনুযায়ী ও অনুপাতে নতুন পদ তৈরি হয়নি, কর্মীদের বিভিন্ন স্টেশনে বদলি করে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। অর্থাৎ সমস্যার গোড়ায় নজর না দিয়ে উপর-উপর সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে, যার প্রভাব মেট্রোর ভাবমূর্তিতে তো বটেই, যাত্রী-পরিষেবাতেও পড়তে বাধ্য। সম্প্রতি নেতাজি ভবন মেট্রো স্টেশন ‘সম্পূর্ণ মহিলা পরিচালিত স্টেশন’-এর তকমা হারাল; পরিচালনগত সিদ্ধান্ত হলেও এ এক প্রতীকী পশ্চাদপসরণও, কলকাতা মেট্রোর আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাবনাটি ধাক্কা খেল। বাস্তব কারণে কর্মী পুনর্বিন্যাসের দরকার হতেই পারে, কিন্তু তার জেরে এমন সিদ্ধান্ত বৃহত্তর সামাজিক বার্তাকেও দুর্বল করে। এ-সব ছাড়িয়েও আসল কথাটি হল: নতুন মেট্রোপথ, স্টেশন ও বর্ধিত সময়সূচি চালু হলেও কর্মীর ঘাটতি, দায়িত্বের অতিরিক্ত চাপ যাতে যাত্রী-পরিষেবায় এসে না পড়ে তা নিশ্চিত করা। মেট্রোর নিজস্ব সমস্যায় যেন যাত্রীরা না ভোগেন; রাতের পরিষেবা যেন নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ হয়।