E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

উদ্বেগ-চিত্র

সম্প্রতি সিবিএসই দ্বাদশ শ্রেণির ফলপ্রকাশের ক্ষেত্রেও উঠেছে মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বিপুল গাফিলতির অভিযোগ। দেড় লক্ষেরও বেশি পরীক্ষার্থী পুনর্মূল্যায়ণের আবেদন জানিয়েছিলেন।

শেষ আপডেট: ২০ জুন ২০২৬ ০৬:১৮
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

দেড় মাসে ১৪ জন। ৩ মে দেশ জুড়ে ডাক্তারির সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা হয়েছিল। তার ন’দিনের মাথায় সেই পরীক্ষা বাতিল হয়। আগামী কাল পুনঃপরীক্ষাটি হওয়ার কথা। তার আগেই সামনে এসেছে এক মর্মান্তিক চিত্র। পরীক্ষা সংক্রান্ত প্রবল চাপ, হতাশায় অন্তত ১৪ জন পরীক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন বলে বিরোধীদের দাবি। তার মধ্যে গত দু’দিনেই আত্মহত্যা করেছেন চার জন। এই কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে গেলে প্রত্যেক পরীক্ষার্থীকেই দীর্ঘ প্রস্তুতি, প্রত্যাশার প্রবল চাপের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে হয়। কেন্দ্রীয় সরকার এবং সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থার যুগপৎ চরম ব্যর্থতায় পরীক্ষার্থীদের আরও এক বার সেই চাপের সম্মুখীন হতে হচ্ছে, যা সামলানোর মতো মানসিক জোর, আর্থিক সামর্থ্য সকলের থাকে না। আত্মহত্যার পরিসংখ্যান সেই রূঢ় বাস্তবকেই প্রকাশ্যে এনেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে যথার্থ ভাবেই কংগ্রেস প্রশ্ন তুলেছে, এতগুলি মৃত্যুর দায় নেবে কে?

দায় যাদের প্রকৃতার্থে নেওয়ার কথা, তারা সেই দায় ঝেড়ে ফেলতে এবং ফাঁপা আশ্বাস দিতে ব্যস্ত। বিরোধীদের দাবি, গত দশ বছরে বিজেপি শাসনে অন্তত ৮৯টি প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি সিবিএসই দ্বাদশ শ্রেণির ফলপ্রকাশের ক্ষেত্রেও উঠেছে মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বিপুল গাফিলতির অভিযোগ। দেড় লক্ষেরও বেশি পরীক্ষার্থী পুনর্মূল্যায়ণের আবেদন জানিয়েছিলেন। সেই ফল এখনও অপ্রকাশিত। অথচ, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলির একে একে ফল প্রকাশিত হচ্ছে। স্বাভাবিক ভাবেই উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ। তাঁদের কেরিয়ার, স্বপ্ন নিয়ে নিরন্তর ট্র্যাপিজ়ের খেলা চলছে। ভারতে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বৃদ্ধির সাম্প্রতিক প্রবণতার অন্যতম কারণটি লুকিয়ে এই ঘটনাপরম্পরার মধ্যেই। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো-র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪-এ দেশে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনা ৪.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, সর্বোচ্চ আদালত যে প্রবণতাকে ‘মহামারি’ আখ্যা দিয়েছে। এক দিকে পরীক্ষা সংক্রান্ত নানাবিধ ধারাবাহিক দুর্নীতি, অন্য দিকে কর্মসংস্থানের ধূসরতর ছবি। দুইয়ের ফাঁসে দম বন্ধ হচ্ছে নবীন প্রজন্মের।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে যে পরিকাঠামো তৈরির কথা বলা হয়েছিল, অনেক ক্ষেত্রে মানা হয়নি তা-ও। কিছু বছর পূর্বেই কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের পক্ষ থেকে একগুচ্ছ নির্দেশিকা প্রস্তুত করা হয় শিক্ষাথীদের মধ্যে সহমর্মিতা, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং সহায়তা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে। নাম রাখা হয় ‘উম্মিদ’। নির্দেশিকায় বলা হয়েছিল, স্কুলগুলিতে ‘ওয়েলনেস টিম’ তৈরির কথা, যারা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিপদসঙ্কেত চিহ্নিত করবে, এবং সেই অনুযায়ী দ্রুত ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করবে। কোভিডকালে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের পরিচর্যায় শিক্ষা মন্ত্রক চালু করে ‘মনোদর্পণ’। কিন্তু বাস্তব বলছে অন্য কথা। শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা প্রতিরোধে শীর্ষ আদালত নিয়োজিত এক জাতীয় টাস্ক ফোর্সের অন্তর্বর্তী রিপোর্টে সম্প্রতি দেখা গিয়েছে, যে ২১১৯টি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমীক্ষা করা হয়েছিল, তার ৬৫ শতাংশেই ছাত্রছাত্রীদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানকারীর সহায়তা দেওয়া হয় না। ৭৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে কোনও পূর্ণ সময়ের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নেই। চার শতাংশেরও কম প্রতিষ্ঠানে আত্মহত্যার ঝুঁকি সংক্রান্ত পর্যালোচনার পরিকাঠামো আছে। তদুপরি, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে বিভেদ-চর্চা এখনও মোছেনি। ধর্ম-জাত-আর্থসামাজিক অবস্থান আজও শিক্ষার্থীদের একাংশকে গভীর অবসাদে ঠেলে দেয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সাহায্য চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার উদাহরণও অজস্র। এক দিকে, প্রত্যাশা, প্রতিযোগিতার চাপ, অন্য দিকে দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবিমৃশ্যকারিতা— এই মৃত্যুমিছিলের শেষ কোথায়?

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
NEET Medical

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy