ইথানল বিতর্ক এখন যে ভাবে ছুটছে, তার গতিবেগ দেখে ভারতীয় গাড়িবাজার নিজেই চমকিত বললে ভুল হয় না। সম্প্রতি আম আদমি পার্টির তরফ থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি নিয়ে ‘বিজেপি পেট্রল পাম্প’ বিদ্রুপটি বেশ জনপ্রিয় হল। বিদ্রুপের সারাংশ সহজ: পুরো দামে পেট্রল পাম্প পেট্রল বিক্রি করলেও ইথানল-অনুপাতের কারণে আসলে পেট্রল কাজ করছে অনেকাংশে কম, এবং সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির ইঞ্জিনও নষ্ট করছে। অবশ্যই, এই অভিযোগটির বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত মর্ম নিয়ে তর্কবিতর্কের অবকাশ থাকলেও সন্দেহ নেই, পেট্রলে ইথানল মিশ্রণ বিষয়ক জ্বালানি নীতি নিয়ে কিছু মৌলিক প্রশ্ন ইতিমধ্যেই জ্বলন্ত। আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের উপর নির্ভরতা কমানো, কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের উৎস সৃষ্টি এবং কার্বন নির্গমন হ্রাসের লক্ষ্যকে সামনে রেখে কেন্দ্রীয় সরকার যে ভাবে দ্রুতগতিতে ই-২০ নীতি নিয়েছে, অর্থাৎ গত বৎসরান্তে ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রিত পেট্রলের ব্যবহার চালু করে অদূর ভবিষ্যতে ২৫ শতাংশ ইথানল ব্যবহারের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তাতে প্রথম প্রশ্নই হল— এই রূপান্তরের জন্য দেশ, বাজার এবং সাধারণ উপভোক্তা কি সত্যিই প্রস্তুত?
অনেক রকমের স্বার্থগোষ্ঠী এই প্রশ্নে জড়িত, স্বাভাবিক ভাবেই। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইতিমধ্যেই গাড়ির মালিকদের একাংশ উদ্বেগ প্রকাশ করছেন গাড়ির মাইলেজ হ্রাস, ইঞ্জিনের কর্মক্ষমতা ইত্যাদি বিষয়ে। গাড়ির মালিক ও চালকরা সন্ত্রস্ত, রক্ষণাবেক্ষণে বিরাট ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা নিয়ে। বিশেষজ্ঞ মহলেও উদ্বেগ। ইথানলের শক্তি পেট্রলের তুলনায় কম হওয়ায় জ্বালানি দক্ষতায় কিছুটা প্রভাব পড়া অস্বাভাবিক নয়। ফলে যদিও আধুনিক ইঞ্জিন প্রযুক্তি এই প্রভাব অনেকাংশে সামাল দিতে সক্ষম, দেশের সড়কে চলাচলকারী বিপুল সংখ্যক পুরনো যানবাহন সেই সামাল দিতে পারবে কি না জানা নেই। তা ছাড়া, চলতি বহু গাড়ি ও মোটরসাইকেল কিন্তু এই ই-২০ জ্বালানির উপযুক্ত নয়। তাই ইথানলের রাসায়নিক বিক্রিয়ার চোটে গাড়ির রাবার, প্লাস্টিক বা ধাতব অংশ দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সাধারণ উপভোক্তা ভাবতেই পারেন যে, পরিবেশ রক্ষার দায়ভার এ বার তা হলে তাঁদের পকেট থেকেই মেটাতে হবে।
এই নীতির আরও একটি বিতর্কিত দিক হল, ইথানল ব্যবহার ও কৃষিক্ষেত্রের সম্পর্ক। ভারতে ইথানল উৎপাদনের প্রধান উৎস আখ ও ভুট্টা। অথচ, আখ একটি অত্যন্ত জলনির্ভর ফসল। যে দেশে এখনও বহু অঞ্চল খরাপ্রবণ, ভূগর্ভস্থ জলের পরিমাণ ক্রমহ্রাসমান, এবং কৃষিসেচ নিয়মিত সঙ্কটের মুখে, সেখানে জ্বালানি উৎপাদনের জন্য অতিরিক্ত কৃষিজ সম্পদ ব্যবহার কি আদৌ সম্ভব, কিংবা সঙ্গত? সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ এখন প্রস্তাবিত নীতির উদ্দেশ্য এবং বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। কেবলমাত্র উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়। দেশের চলমান যানবাহন যাতে নিরাপদে এই জ্বালানি ব্যবহার করতে সক্ষম হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। জনগণকে স্পষ্ট জানাতে হবে, যে সব গাড়ি ই-২০ উপযোগী নয়, সেগুলি নিয়ে কী কর্তব্য। ভারতের জ্বালানি ভবিষ্যৎ নিয়ে বিচারবিবেচনা অবশ্যই একটি জরুরি কাজ। কিন্তু বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা এবং সর্বোপরি জনস্বার্থের সঙ্গে বড় মাপের আপস করে কোনও জ্বালানি বিপ্লবের সূচনা করা যায় না।