খাস মধ্য কলকাতায়, দমকলের সদর দফতর থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে যখন অগ্নিগ্রাস গভীর রাতে ন’টি প্রাণ কেড়ে নেয়, এবং প্রকাশ্যে আসে হরেক বিধি-বহির্ভূত কাজের নমুনা, তখন সমগ্র ঘটনাটিকে নিছক দুর্ঘটনা বলা চলে না। বরং বলা ভাল, দীর্ঘ দিন ধরে বিপদের মাত্রাটি জেনেও নীরব থেকে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটতে দেওয়া হয়েছে। এবং তার জন্য হোটেলের মালিক তো বটেই, পুলিশ-প্রশাসনও সম্পূর্ণত দায়ী। নয়তো একই বহুতলের মধ্যে অন্তত দশটি হোটেল-অতিথিশালা বিপজ্জনক ভাবে গড়ে উঠলেও পুলিশ-প্রশাসন তার খবরমাত্র পায়নি— এমনটি বিশ্বাস করা কঠিন। দমকলের এত কাছের বাড়িতে আগুন লেগে এতগুলি প্রাণই বা যায় কী করে? হোটেল-অতিথিশালার কোনও বাণিজ্যিক লাইসেন্স নেই, নেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, আপৎকালীন পথ, দীর্ঘ দিন হয়নি ফায়ার অডিট। দায়িত্বপ্রাপ্তরা কি নিজ দায়িত্ব সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছিলেন? গত বছরের এপ্রিলে মেছুয়া ফলপট্টির এক হোটেলের অগ্নিকাণ্ডেও এই একই অভিযোগ উঠে এসেছিল। চোদ্দো জনের প্রাণহানি হয়েছিল সে বার। অতঃপর শহরের অগ্নি সুরক্ষাবিধিকে ঢেলে সাজানোর পক্ষে ষোলো মাস যথেষ্ট সময়। কিন্তু সে কাজ যে বিশেষ এগোয়নি, শুধুমাত্র ফাঁকা বুলি কপচানোই চলেছে, সাম্প্রতিক ঘটনায় তা স্পষ্ট। প্রত্যেক বার শবদেহের মিছিল দেখবে কলকাতা, তবে কি দায়িত্বপ্রাপ্তরা ভান করবেন যে, নিজেদের কর্তব্য তাঁদের স্মরণে এসেছে? এবং অপেক্ষা করবেন, কখন ঘটনাটি জনস্মৃতি থেকে সরে যায়, যাতে তাঁরাও অবহেলার নিয়মে ফিরতে পারেন?
বস্তুত নির্মাণের ক্ষেত্রে অনিয়মের প্রশ্রয়কে প্রায় শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছিল পূর্ববর্তী তৃণমূল কংগ্রেস জমানা। তার ফল এখনও বহু দিন ভুগতে হবে কলকাতা-সহ গোটা রাজ্যকে। মেছুয়া ফলপট্টির হোটেল, আনন্দপুরের গুদাম, কলকাতা-হাওড়ার একাধিক জনবহুল বাজারে অগ্নিকাণ্ডের কারণে প্রাণহানি, সম্পত্তিহানি তারই যৎসামান্য প্রমাণ। একই সুতোয় বাঁধা তারাপীঠের হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে, দমবন্ধ হয়ে ন’জনের মৃত্যুর ঘটনাও। বস্তুত, মাত্র দিনকয়েকের ব্যবধানে তারাপীঠ ও মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা পরম্পরায় প্রায় কোনও পার্থক্য নেই। তফাত, তারাপীঠের হোটেলের নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল, দু’টি সিঁড়ির ব্যবস্থা ছিল, হোটেলের পিছনে নিরাপদ রাস্তাও ছিল। কিন্তু বিপদ-মুহূর্তে সে সব কোনও কাজে আসেনি। কারণ, আপৎকালীন ব্যবস্থার কোনওটিই যথাযথ অবস্থায় ছিল না। জানা গিয়েছে, তারাপীঠের মতো জনবহুল ধর্মীয় স্থানে আরও বেশ কিছু হোটেল নিয়ম না মেনেই চলছে। অর্থাৎ, সমগ্র রাজ্যেই নজরদারি ব্যবস্থায় সুবিশাল ফাঁক। প্রসঙ্গত, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কলকাতা পুরসভার ট্রেড লাইসেন্স পেতে হলে অনলাইনে আবেদন করে নির্দিষ্ট ফি জমা দিলেই চলে। নবীকরণের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি। নির্দিষ্ট অভিযোগের বাইরে ব্যবসা নিয়ম মেনে হচ্ছে কি না, তা যাচাই করার জন্য পর্যাপ্ত পরিকাঠামো, কর্মী নেই পুরসভার। ফলে জরুরি নথিপত্র ছাড়াই ট্রেড লাইসেন্স পাওয়া ব্যবসায় অনিয়মই এখন নিয়মে পরিণত। দুর্ঘটনা সেখানে কোনও অপ্রত্যাশিত বিষয় নয়— বরং, দুর্ঘটনা না-ঘটাই বিস্ময়কর।
সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডে বর্তমান বিজেপি সরকার রীতিমাফিক সমস্ত দোষ চাপিয়েছে তৃণমূল জমানার উপর। তাঁদের মনে করিয়ে দেওয়া ভাল, এ রাজ্যে বিজেপিও ১০০ দিন সাড়ম্বরে পার করে ফেলেছে। তার নানা পর্যায়ে আগের জমানার ভুলের পুনরাবৃত্তি হবে না— বলে বিস্তর ঢাক পেটানোও চলেছে। কিন্তু বুলডোজ়ার-সহযোগে কিছু স্থানে প্রবল উচ্ছেদ ব্যতিরেকে বেআইনি নির্মাণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কাজ এখনও নজরে পড়েনি। শহরে অগ্নিকাণ্ডের বিবিধ ঘটনা তাঁদের অজানা নয়। সেই অঘটনগুলি রোখার রাস্তাটিও প্রশাসকদের অপরিচিত নয়। দোষারোপ, হুঙ্কার ছেড়ে এ বার পথে নেমে কাজ করার পালা।