আড়াই বছর আগে কেন্দ্রীয় সড়ক মন্ত্রকের তরফে চালু করা হয়েছিল অ্যাপ। থানা অফিসারদের কাছে নির্দেশ গিয়েছিল দুর্ঘটনা সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য অ্যাপে আপলোড করার। বলা হয়েছিল, পথ-দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের পরিবার এতে কোনও রকম হয়রানি ছাড়াই দ্রুত ক্ষতিপূরণ পাবে। একটি অ্যাপের মধ্যেই যদি দুর্ঘটনার যাবতীয় বিবরণ, গাড়ির তথ্য, আহত ও মৃতদের বিবরণ ও ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত রিপোর্ট থাকে, তবে হাসপাতাল, সড়ক কর্তৃপক্ষ ও বিমা সংস্থাগুলি দ্রুত ওই অ্যাপ বা পোর্টাল থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য, রিপোর্ট পেয়ে যাবে। ফলে পরবর্তী কাজগুলি তুলনায় মসৃণ ও সহজতর হবে। কিন্তু দীর্ঘ দিনই পশ্চিমবঙ্গে সরকারি উদ্দেশ্য ও তা পূরণের মধ্যের ফাঁকটি সুবিশাল থেকেছে। এ ক্ষেত্রেও অন্যথা হয়নি। কিছু দিন চলার পরেই নজরদারির অভাবে কলকাতা পুলিশের বিভিন্ন থানা এলাকায় তথ্য আপলোড করার কাজটি বন্ধ হয়। সেই বন্ধ চাকা সম্প্রতি ঘোরার ইঙ্গিত মিলেছে। লালবাজারের তরফে থানার আধিকারিকদের নিয়ে এক বৈঠকে পথ-দুর্ঘটনার পিছনে প্রকৃত কারণটি কী, অভিযুক্ত চালকের বিস্তারিত তথ্য-সহ সব তথ্য অ্যাপে তোলা বাধ্যতামূলক করেছে লালবাজার।
ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো-র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতের অন্য বড় শহরগুলির তুলনায় কলকাতায় পথ-দুর্ঘটনার ছবিটি ভাল। ২০২৩ সালে যেখানে দিল্লিতে পথ-দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৪৫৭ জন, বেঙ্গালুরুতে ৯১৫ জন, মুম্বইতে ৫০৩ জন, সেখানে কলকাতায় সংখ্যাটি ২০৪। অনস্বীকার্য যে, পথ-দুর্ঘটনা রোধে কলকাতা পুলিশ ও প্রশাসন বিগত কয়েক বছরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ করেছে, যার অন্যতম ‘সেফ ড্রাইভ, সেভ লাইফ’-এর প্রচার ও বিভিন্ন পরিকাঠামো ও নজরদারি বৃদ্ধি। এমনকি, বেপরোয়া বাসচালকদের চিহ্নিত করে তাঁদের নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বাস-অটো-ট্যাক্সি চালকদের নিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। কিন্তু তাতেও ফাঁকগুলি সম্পূর্ণ ঢাকা যায়নি। বিশেষ করে, রাতের দিকে বিশেষ কিছু অঞ্চলে পুলিশি নজরদারি প্রায় অনুপস্থিত থাকায় বেপরোয়া ও মদ্যপ চালকদের গতির বলি হয়েছেন বহু মানুষ। উৎসবের দিনগুলিতে আনন্দযাপনের নামে শহরের রাস্তায় যে গতির ঝড় বয়, তাকে ঠেকাতেও এত কাল খুব কার্যকর ভূমিকা দেখা যায়নি পুলিশ-প্রশাসনের। বরং উৎসব-শেষে নিয়মমাফিক ধরপাকড়ের হিসাব দিয়েই পুলিশ তার কর্তব্য সেরেছে।
কলকাতার মতো জনবহুল শহরে, যেখানে গাড়ির সংখ্যার অনুপাতে চলাচলযোগ্য প্রশস্ত রাস্তার পরিমাণ যথেষ্ট কম, সেখানে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ বিষয়ক যে কোনও পদক্ষেপকে স্বাগত জানানো বিশেষ প্রয়োজন। জানা গিয়েছে, অ্যাপটিতে দুর্ঘটনার স্থান চিহ্নিতকরণ থেকে শুরু করে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ, সংশ্লিষ্ট রাস্তাটির অবস্থা কেমন, কোন সময়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে, দুর্ঘটনাস্থলের দৃশ্যমানতা প্রভৃতি বহু জরুরি তথ্য দিতে হবে। এই তথ্যগুলি থেকে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে পরবর্তী কালের দুর্ঘটনাগুলি আটকানো সম্ভব। রাস্তা যদি গর্তসর্বস্ব হয়, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকে, ফুটপাত, আন্ডারপাস না থাকে, তবে আগামী দিনে সেই ব্যবস্থাগুলি দ্রুত করে নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। বিলম্ব যথেষ্ট হয়েছে। এ বার কাজ করার পালা।