উচ্চ শিক্ষারও রয়েছে এক ‘ভূগোল’। ভারতের মতো বিশাল দেশে কোন রাজ্যে কত উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার উপযুক্ত বয়সি ছাত্রসংখ্যার নিরিখে তাদের বিস্তার এই মুহূর্তে কেমন— জানা যায় তা থেকে। শিক্ষা নিয়ে কর্মরত দুই অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক রিপোর্ট জানাল, ভারতে গত পঁচিশ বছরে নতুন ৩৪,৮৪০টি কলেজ ও ৯৮০টি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়েছে; ১৮-২৩ বছর বয়সি প্রতি এক লক্ষের অনুপাতে কলেজ-সংখ্যা ৯ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৭। সার্বিক ভাবে আশাব্যঞ্জক চিত্র, কিন্তু রিপোর্ট বলছে, উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এই বিস্তার দেশের সর্বত্র সমান নয়; বিশেষত বিহার, উত্তরপ্রদেশ ও ঝাড়খণ্ডে তরুণ জনসংখ্যার তুলনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কম। ২০২৩-২৪’এ বিহারে উচ্চ শিক্ষায় মোট ভর্তির হার (গ্রোস এনরোলমেন্ট রেশিয়ো) ছিল ১৭.৬৬%, ঝাড়খণ্ডে ১৯.৪৩%, উত্তরপ্রদেশে ২৫.৯৭%— জাতীয় গড় যেখানে প্রায় ৩০ শতাংশ। ‘সরকারি তথ্য নয়’ বলে এড়ানোর উপায় নেই। কেন্দ্রেরই সর্বভারতীয় উচ্চ শিক্ষা সমীক্ষা (এআইএসএইচই) ২০২২-২৩ মতে, উত্তরপ্রদেশে সে সময় ছিল ৮৩১০টি কলেজ ও ৯১টি বিশ্ববিদ্যালয়। রাজ্যটির তরুণ-জনসংখ্যার নিরিখে এ যে যথেষ্ট নয়, গত বছর ফেব্রুয়ারিতে তা বলেছে নীতি আয়োগও: ১৮-২৩ বছর বয়সি প্রতি লক্ষে উত্তরপ্রদেশে বিশ্ববিদ্যালয় সংখ্যা ০.৩, জাতীয় গড় যেখানে ০.৮।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উচ্চ শিক্ষায় এক জরুরি চিহ্নক। তা বলে প্রতিষ্ঠানের মোট সংখ্যা দিয়ে যে কোনও রাজ্যের উচ্চ শিক্ষার উৎকর্ষ মাপা চলে না, তাও বোঝা দরকার। বোঝা দরকার, উচ্চ শিক্ষা-প্রত্যাশী বা উচ্চ শিক্ষা-অভিমুখী তরুণ জনসংখ্যার অনুপাতে কত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে— তা আরও গুরুত্বপূর্ণ। দেশে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কয়েকটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হয়ে থাকার বিপদ রয়েছে। উল্লিখিত প্রথম রিপোর্টটি সেই বিপদ তুলেও ধরেছে— ভারতে মাত্র ২০টি জেলা জুড়ে রয়েছে দেশের ২৮% বিশ্ববিদ্যালয়। দেশময় বিপুল যুবস্রোত সেই সব জায়গায় যে চাইলেই উচ্চ শিক্ষার জন্য যেতে পারবে তা নয়। সেগুলিতে ভর্তির সুযোগ পাওয়া তো অনেক পরের কথা, তারও আগে রয়েছে পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, লৈঙ্গিক বৈষম্য, ভারতের তরুণদের উচ্চ শিক্ষায় যা বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
তা হলে করণীয় কী? রাজ্য সরকারের মাথারা নিজেদের সাফল্যের ফিরিস্তিতে অনেক সময়েই তুলে ধরেন— এতগুলো নতুন বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়ে দিলাম, আমাদের আমলে এতগুলি নতুন কলেজ তৈরি হয়েছে— ইত্যাদি বাক্যবন্ধ। তাঁদের সামনে এই রিপোর্টগুলি তুলে ধরা দরকার। বোঝানো দরকার, উচ্চ শিক্ষার প্রসারে অবশ্যবিবেচ্য রাজ্যের তরুণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির তথ্যও। এই তথ্য জেলা স্তর থেকে থাকলে সহজেই বোঝা যাবে কোথায় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার মতো তরুণ জনসংখ্যা বেশি। সেই অনুযায়ী নতুন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা প্রয়োজন। যুব-জনসংখ্যা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আসন, শিক্ষক-সংখ্যা, বিষয়ভিত্তিক সুযোগ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা— সব কিছুকে একত্রে বিচার করতে হবে। বিচ্ছিন্ন ভাবে, কিংবা ফাঁকা জায়গা আছে বলেই কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় ‘বসিয়ে’ সমস্যার সমাধান হবে না। উচ্চ শিক্ষা শুধু মহানগর ও বড় শহরে কেন্দ্রীভূত হয়ে থাকলে বাড়বে আঞ্চলিক ও সামাজিক বৈষম্যও।