E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

লজ্জা

দেশ স্বাধীন হয়েছে আট দশক আগে। এই দীর্ঘ সময়ে ভারত বহু দূর এগিয়েছে, সন্দেহ নেই— যে দেশকে ক্ষুধার অন্নের সংস্থান করতে পিএল-৪৮০’র মুখাপেক্ষী হতে হয়েছিল এক সময়, সে দেশই সফল ভাবে টেলিকম বিপ্লব ঘটিয়েছে, পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ করেছে, চন্দ্রযান পাঠিয়েছে।

শেষ আপডেট: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:৪১

গত কয়েক বছরে গোটা দুনিয়া জেন-জ়ি প্রতিবাদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠেছিল। ভারতও হয়েছে। সেই ঢেউ না-থিতোতেই দেখা যাচ্ছে জেন-আলফা প্রতিবাদীদের মুখ। জেন-জ়ি’র পরের প্রজন্ম— ২০১১ বা তার পরে যাদের জন্ম। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বারে বারে সংবাদ মিলেছে, কোথাও তারা অতিভঙ্গুর স্কুলবাড়ির পরিবর্তে প্রতিশ্রুত নতুন ভবনের দাবিতে দাবিতে প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়েছে, কোথাও তারা দাবি করছে সংস্কার, কোথাও শিক্ষকদের মনোযোগ। রাজনৈতিক পক্ষপাত বা অন্য কোনও অবস্থান থেকে সরে দাঁড়িয়ে যদি এই দৃশ্যটির দিকে তাকানো যায়— স্কুল-ইউনিফর্ম পরিহিত শিশুর দল আন্দোলন করতে রাস্তায় নেমেছে— যে কোনও বিবেকবান নাগরিকের বুক ভেঙে যেতে বাধ্য। এই শিশুগুলির মুখে নিজের সন্তানের মুখ দেখার আবেগতাড়িত উপলব্ধির প্রয়োজন নেই— শুধু এটুকু ভাবলেই চলবে যে, পরিস্থিতি যাদের ‘আন্দোলন’ করতে বাধ্য করেছে, তাদের অনেকেই হয়তো এখনও ‘আন্দোলন’ বানানটুকুও লিখতে শেখেনি। জেন-জ়ি’র প্রতিনিধিদের সিংহভাগ তবুও প্রাপ্তবয়স্ক, দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের যোগ্যতা অর্জন করা নাগরিক। কিন্তু, জেন-আলফা নামক প্রজন্মের একটি ছেলেমেয়েও এখনও আঠারো বছরের সীমা অতিক্রম করেনি। তাদের সর্বোচ্চ বয়স ১৫ বছর। স্কুলে নিরাপদে বসে পড়তে পারার মতো অতি মৌলিক এবং অতি সামান্য দাবিতে তাদের পথে নেমে আন্দোলন করতে হচ্ছে, এই দৃশ্যটি ভারতীয় গণতন্ত্রের এক বিপুল ব্যর্থতার প্রমাণ। এত বড় লজ্জার সামনে মাথা নত হয়ে আসাই স্বাভাবিক।

সে ব্যর্থতা অবশ্যই রাষ্ট্রের। দেশ স্বাধীন হয়েছে আট দশক আগে। এই দীর্ঘ সময়ে ভারত বহু দূর এগিয়েছে, সন্দেহ নেই— যে দেশকে ক্ষুধার অন্নের সংস্থান করতে পিএল-৪৮০’র মুখাপেক্ষী হতে হয়েছিল এক সময়, সে দেশই সফল ভাবে টেলিকম বিপ্লব ঘটিয়েছে, পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ করেছে, চন্দ্রযান পাঠিয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থব্যবস্থা হয়ে উঠেছে ভারত। অথচ, শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক, অতি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পরিকাঠামো অবহেলিতই থেকে গিয়েছে। শাসন ক্ষমতার রাজনৈতিক রং পাল্টেছে, বঞ্চনার এই আখ্যান পাল্টায়নি। বরং, শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের মতো অধিকার ক্রমে ক্রয়ক্ষমতার বিষয় হয়ে উঠেছে। যাঁদের টাকার জোর আছে, তাঁরা সন্তানকে পাঠিয়েছেন বেসরকারি স্কুলে— যার পরিকাঠামো নিয়ে ভাবতে হয় না। যাঁরা পেরেছেন, টাকার জোরে স্বাস্থ্য কিনেছেন বেসরকারি ব্যবস্থা থেকে। যাঁরা পারেননি, তাঁরা অবহেলিতই থেকে গিয়েছেন। তাঁদের নাবালক সন্তানদের আজ প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় নামতে হয়েছে, রাষ্ট্রযন্ত্রের থেকে নিজেদের ন্যূনতম অধিকারটুকু আদায় করে নিতে। যে দেশ বিশ্বশক্তি হয়ে ওঠার উচ্চাকাঙ্ক্ষা গোপন করে না, তার এই ব্যর্থতা অক্ষমণীয়।

নাগরিকেরও কি লজ্জা নয়? ভারতে গণতন্ত্রের পরিসর ক্রমে যতই খণ্ডিত হতে থাকুক, নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি এখনও অপরিবর্তিত রয়েছে। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর রাজনৈতিক দলগুলিকে নাগরিকের অনুমোদন প্রার্থনা করতে হয়। সেই প্রাপ্তবয়স্ক, ভোটাধিকারসম্পন্ন নাগরিক কি কখনও প্রশ্ন করেছে, জিডিপির অনুপাতে শিক্ষাখাতে ব্যয় বাড়ে না কেন? বহু স্কুলে কেন এখনও শৌচাগারের ব্যবস্থা নেই, কেন একাধিক শ্রেণির ছাত্রছাত্রীকে একই ক্লাসঘরে বসতে হয়, কেন বহু স্কুলে ছাত্রের অনুপাতে শিক্ষকের সংখ্যা অতি কম? বারে বারেই কেন সমীক্ষায় দেখা যায় যে, অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী তাদের বয়স বা শ্রেণির অনুপাতে অনেক কম শিখেছে? বাড়িতে ভোট চাইতে আসা প্রার্থীর কাছে ক’জন নাগরিক এই প্রশ্নগুলি করে তার জবাব চেয়েছেন? এ প্রশ্ন তো শিশুদের করার কথা ছিল না— প্রশ্নগুলি করার কথা ছিল প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের। তাঁরা এই ব্যবস্থাকে পাল্টাতে ব্যর্থ হয়েছেন— বস্তুত, সে চেষ্টাই করেননি। জেন-আলফার মিছিল দেখে তাঁদেরও কি লজ্জায় মুখ লুকানোর কথা নয়?

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Generation Alpha Generation Z Students Protest Central Government Indian Education System

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy